বিশ্বের সবচেয়ে বড় কণাত্বরণ যন্ত্র এলএইচসি ৪ বছরের জন্য বন্ধ, ২০৩০ সালে নতুন রূপে চালু
এলএইচসি ৪ বছরের জন্য বন্ধ, ২০৩০ সালে নতুন রূপে চালু

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী কণাত্বরণ যন্ত্র লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (এলএইচসি) আগামী চার বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কিংবা কোনো পরীক্ষা করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটার কারণে বন্ধ করা হয়নি। বিজ্ঞানীরা এটিকে আরও উন্নত করতে চান। তাই পরিকল্পনা করেই সাময়িকভাবে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে, যেন একে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করে তোলা যায়।

হাইলুমি এলএইচসি: নতুন সক্ষমতা

২৯ জুন, সোমবার কণাত্বরণ যন্ত্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সব আধুনিকায়ন ও সংস্কার শেষে ২০৩০ সালে এটি হাই-লুমিনোসিটি লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার বা সংক্ষেপে হাইলুমি এলএইচসি নামে নতুন রূপে চালু হবে। এই আধুনিকায়নের ফলে যন্ত্রটি এর মূল নকশার চেয়ে একসঙ্গে প্রায় ১০ গুণ বেশি কণার সংঘর্ষ ঘটাতে পারবে।

বিজ্ঞানীদের আশা, যন্ত্রটির নতুন এই সক্ষমতা মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে সম্পূর্ণ নতুন সব আবিষ্কারের পথ খুলে দেবে। এর মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটার, অ্যান্টিম্যাটার এবং মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকের অবস্থা কেমন ছিল, সে সম্পর্কে আরও নিখুঁত ও নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিজ্ঞানীদের প্রতিক্রিয়া

হাইলুমি এলএইচসি প্রকল্পের প্রধান মার্কাস জারলাউথ বলেন, ‘এটি বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। সোমবার থেকে তাঁরা কণা পদার্থবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন এক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এলএইচসির ইতিহাস ও গুরুত্ব

২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো সফলভাবে প্রোটন কণার সংঘর্ষ ঘটানোর পর থেকেই লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার পদার্থবিজ্ঞানীদের দারুণভাবে সাহায্য করে আসছে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা কণা পদার্থবিজ্ঞান ও পারমাণবিক জগতের মৌলিক নিয়মগুলোর তত্ত্ব যাচাই করার সুযোগ পান। ২০১২ সালে হিগস বোসন বা ঈশ্বর কণা আবিষ্কারে এই যন্ত্রটি প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। তখন এটি ক্ষুদ্র কণাগুলো কীভাবে ভর লাভ করে, তা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করেছিল। ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ড সীমান্তে জেনেভার কাছে মাটির নিচে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বৃত্তাকার সুড়ঙ্গে বিশাল এই যন্ত্রটি অবস্থিত।

কাজের সুবিধার জন্য কোলাইডারটি এর আগেও পরিকল্পিতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বর্তমান বিরতিটি এর ইতিহাসের তৃতীয় দীর্ঘমেয়াদি শাটডাউন। এর আগে ২০১৩ সালে প্রথমবার দুই বছরের জন্য এটি বন্ধ রাখা হয়। তখন যন্ত্রটির সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট সংযোগ উন্নত করার পাশাপাশি প্রোটন রশ্মির শক্তি বাড়ানো হয়েছিল। এরপর ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বন্ধের সময় যন্ত্রটির বিভিন্ন অংশের আধুনিকায়ন, পুরোনো যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয়।

বর্তমান শাটডাউনের পরিকল্পনা

‘লং শাটডাউন ৩’ (এলএস৩) নামে বর্তমান বিরতির সময়ে বিশেষজ্ঞরা কোলাইডারের উজ্জ্বলতা প্রায় ১০ গুণ বাড়ানোর জন্য নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি যুক্ত করবেন। ফলে কণাগুলোর সংঘর্ষের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে কণাগুলোর একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার হার প্রায় তিন গুণ বাড়িয়ে দেবে নতুন এই ব্যবস্থা। এই যন্ত্রটি যখন আবারও চালু হবে, তখন এটি ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের নিত্যনতুন আবিষ্কারে সাহায্য করবে। এরপর কার্যকাল শেষ হয়ে গেলে একে সরিয়ে আরও নতুন ও উচ্চশক্তির একটি পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটর যন্ত্র স্থাপন করা হবে।

সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সার্নের মহাপরিচালক মার্ক থমসন জানান, ‘এটি সত্যিই মহাবিশ্বকে নতুন উপায়ে জানার ও অন্বেষণ করার দারুণ এক সুযোগ, যা আমরা আগে কখনোই করতে পারিনি।’

আবিষ্কারের সম্ভাবনা

যন্ত্রটির এই বিশাল উন্নতির ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য পাওয়া যাবে। এটি বিজ্ঞানীদের হিগস বোসনের মতো পরিচিত কণাগুলোকে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ করে দেবে। পাশাপাশি মহাবিশ্বের অনেক বিরল ঘটনা দেখার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে তুলবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হাইলুমি এলএইচসি আগামী এক দশকে প্রায় ৩৮ কোটি হিগস বোসন কণা তৈরি করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে; যেখানে যন্ত্রটি এ পর্যন্ত মাত্র ৫ কোটি ৫০ লাখ কণা তৈরি করতে পেরেছে। বিশালসংখ্যক এই কণা পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের নানা জটিল সমস্যার সমাধান করতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। কারণ, বর্তমান স্ট্যান্ডার্ড মডেলটি ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জির মতো বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারে না, অথচ এগুলো মহাবিশ্বের ভর ও শক্তির প্রধান অংশজুড়ে রয়েছে।

প্রকল্পের চ্যালেঞ্জ

পুরো প্রক্রিয়ার সমন্বয়কারী দলের প্রধান জঁ-ফিলিপ টক এক বিবৃতিতে জানান, ‘বর্তমান বিরতির কাজগুলো পরিচালনা করা প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনার দিক থেকে বিশাল এবং জটিল এক কর্মযজ্ঞ। শুধু মূল কোলাইডারেরই প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার এলাকার পুরোনো চুম্বক ও যন্ত্রপাতি সরিয়ে সেখানে নতুন সব উন্নত সরঞ্জাম বসানো হবে। পুরো গবেষণাগারজুড়ে এমন আরও কয়েক ডজন প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার প্রকৌশলী, পদার্থবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ একসঙ্গে কাজ করবেন।’

বন্ধকালীন গবেষণা

শাটডাউনের এই সময়ে যন্ত্রটির ভেতরে নতুন করে কোনো কণার সংঘর্ষ ঘটানো হবে না ঠিকই, তবে গবেষকেরা বসে থাকবেন না। তাঁরা এর আগে চালানো বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে পাওয়া বিশাল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করার কাজ চালিয়ে যাবেন।

প্রযুক্তির ব্যবহার

লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের প্রধান লক্ষ্য মহাবিশ্বের মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করা। একে উন্নত করতে গিয়ে যেসব প্রযুক্তি তৈরি হয়, তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও কাজে লাগে। সার্নের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন করা বিভিন্ন প্রযুক্তি ও কৌশল এখন চিকিৎসাক্ষেত্রের মেডিকেল ইমেজিং, নানা ধরনের সেন্সর এবং পুরোনো বা নষ্ট হয়ে যাওয়া মূল্যবান শিল্পকর্ম উদ্ধারের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।