৭০০ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহের আবহাওয়া জানাল জেমস ওয়েব
৭০০ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহের আবহাওয়া জানাল জেমস ওয়েব

আবহাওয়ার খবর নিয়ে মানুষের আলাদা আগ্রহ রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই আমরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার চেষ্টা করে আসছি। সে না হয় পৃথিবীর জলবায়ু বলে কথা, কিন্তু তাই বলে আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ৭০০ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এক বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহের আবহাওয়ার খোঁজখবর নেওয়া তো সহজ কথা নয়! জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের কল্যাণে এই অসাধ্য সাধন করেছেন অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক সাগ্নিক মুখার্জি ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁরা WASP-94A b নামে এক দানবীয় গ্যাসীয় গ্রহের মেঘচক্র আবিষ্কার করেছেন। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ডেটা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, এই গ্রহের সকালের দিকে আকাশ মেঘলা থাকে, আর সন্ধ্যায় আকাশ থাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সম্প্রতি তাঁদের এই গবেষণাপত্রটি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

আবিষ্কারের পথ

সাধারণ টেলিস্কোপের সাহায্যে হঠাৎ করেই বিজ্ঞানীরা এই তপ্ত এক্সোপ্ল্যানেটের সন্ধান পাননি। ২০১৪ সালে ক্যানারি আইল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত দুটি রোবোটিক অবজারভেটরির সাহায্যে নতুন নতুন এক্সোপ্ল্যানেটের সন্ধান চালাচ্ছিলেন বিজ্ঞানীরা। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এটি ওয়াইড অ্যাঙ্গেল সার্চ ফর প্ল্যানেট বা WASP প্রকল্প নামে বহুল পরিচিত। এ সময় ট্রানজিট পদ্ধতির সাহায্যে গবেষকেরা WASP-94A b গ্রহটির সন্ধান পান।

ট্রানজিট পদ্ধতি হলো, কোনো গ্রহ যখন তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রটির আলোর তীব্রতা সাময়িক সময়ের জন্য সামান্য কমে যায়। নক্ষত্রের আলো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে থাকা বিভিন্ন গ্যাস ও জলীয় বাষ্পের ভেতর দিয়ে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে পৌঁছায়। আলোর এই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা এক্সোপ্ল্যানেটটির অস্তিত্ব টের পান। সেই সময় তাঁরা লক্ষ করেন, এর আশপাশে দুটি নক্ষত্র (WASP-94A ও WASP-94B) একে অপরকে প্রদক্ষিণ করছে। অর্থাৎ এটি আদতে একটি বাইনারি স্টার সিস্টেমের অংশ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রহের বৈশিষ্ট্য

এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রায় ৬ হাজারের বেশি বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ আবিষ্কার করেছেন। সেগুলোর মধ্যে এই WASP-94A b গ্রহটি অন্যতম। বৃহস্পতির চেয়ে আকারে সামান্য বড় এই এক্সোপ্ল্যানেটটি WASP-94A নামে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করে। পৃথিবীর দিনের হিসাবে মাত্র ৪ দিনেই এটি নক্ষত্রের চারপাশে একবার পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে। গ্রহটির একটি দিক সব সময় নক্ষত্রের দিকে বাঁকানো বা মুখ করা থাকে। ফলে এক দিকে চিরস্থায়ী দিন, অন্যদিকে দেখা যায় চিরন্তন রাত্রি। জেমস ওয়েব এই আলো ও অন্ধকার প্রান্তের ছবি হাজির করেছে গবেষকদের সামনে। নক্ষত্রের আলো গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান কর্তৃক নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে। ফলে আলোকিত ও অন্ধকার অঞ্চলের আলাদা আলাদা বর্ণালি সৃষ্টি হয়, এক্সোপ্ল্যানেটের গবেষণায় যেগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।

অদ্ভুত মেঘচক্র

এই আজব গ্রহের মেঘচক্র নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এখানকার আবহাওয়া বেশ চরমভাবাপন্ন; সকালে মেঘাচ্ছন্ন তো সন্ধ্যায় পরিষ্কার! আবহাওয়ার এই চরম বৈপরীত্যই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এখানকার মেঘে জলীয় বাষ্পের পরিবর্তে পাওয়া যায় ম্যাগনেসিয়াম সিলিকেট, লোহা এবং ম্যাগনেসিয়াম সালফাইডের মতো শিলা গঠনকারী খনিজ। এ জন্য গবেষকেরা একে পাথুরে মেঘ বলেন। এখানে দিনের তুলনায় রাতে তাপমাত্রা প্রায় ৪৫০ কেলভিন কম থাকে। তাই রাতের শীতল বাতাস যখন দিনের আলোতে প্রবেশ করে, তখন আকাশে ঘন পাথুরে মেঘের দেখা মেলে। আবার নক্ষত্রের খুব কাছে থাকার কারণে WASP-94A b গ্রহের বায়ুমণ্ডল থাকে প্রচণ্ড উষ্ণ; দিনের বেলায় এর উপরিভাগের তাপমাত্রা ১ হাজার ২০০ কেলভিন ছাড়িয়ে যায়। এ সময় প্রচণ্ড তাপে ঘন পাথুরে মেঘ বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে মিশে যায়। ফলে বিকেলে আকাশ থাকে একদম ঝকঝকে পরিষ্কার।

জেমস ওয়েবের ভূমিকা

জেমস ওয়েবের আগে বিজ্ঞানীরা হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন। সে সময়ের প্রাপ্ত ডেটা থেকে ধারণা করা হতো, এই গ্রহে কার্বন ও অক্সিজেনের প্রাচুর্য মাত্রাধিক। কিন্তু বর্তমানে জেমস ওয়েবের ডেটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, পুরোনো সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। সে সময়ে এই গ্রহের পাথুরে মেঘের ছায়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ব্যর্থ হয়েছিলেন গবেষকেরা। পরবর্তীতে মেঘের উপাদান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহস্পতির তুলনায় এখানে ৫ গুণ বেশি কার্বন ও অক্সিজেন রয়েছে, যা একটি সাধারণ গ্যাসীয় গ্রহে থাকতেই পারে। আসলে আগে হাবলের ডেটা বিশ্লেষণ করে গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের একটি গড় চিত্র পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমান গবেষণায় বিভিন্ন স্থানভিত্তিক চিত্র সহজে পাওয়া যায়। আর পরিসংখ্যানগত গড়ের তুলনায় স্থানভিত্তিক ডেটা যে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পক্ষে বেশি সহায়ক, গবেষকেরা তা বিলক্ষণ জানেন।

গবেষণার গুরুত্ব

মুখার্জি ও তাঁর সহযোগীদের এই গবেষণা দূরবর্তী বিশ্বের আবহাওয়া বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলো যেমন বিভিন্ন ধরনের—মঙ্গল পাথুরে, নেপচুন গ্যাসীয়—তেমনি বহির্বিশ্বের গ্রহগুলোর প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও এই গবেষণা সহায়ক হতে পারে। আসলে এক্সোপ্ল্যানেট গবেষণায় বহুল চর্চিত প্রশ্ন হলো, বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহগুলো কী উপাদান দিয়ে গঠিত; আর সে জন্য মেঘের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা ছাড়া গবেষকদের গতি নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এ রকম অদ্ভুত মেঘচক্র কি কেবল WASP-94A b গ্রহেই দেখতে পাওয়া যায়, নাকি এ জাতীয় আরও এক্সোপ্ল্যানেট মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে? সে জন্য এ বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জরুরি। আশা করি, জেমস ওয়েবের অত্যাধুনিক টেলিস্কোপগুলো ভাবী প্রজন্মের গবেষকদের হতাশ করবে না।