কচু থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন উদ্ভাবন করলেন ময়মনসিংহের ছয় তরুণ-তরুণী
ময়মনসিংহের গৌরীপুর টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের ছয় তরুণ-তরুণী কচুর স্টার্চ ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পলিথিন উদ্ভাবন করেছেন। এই উদ্ভাবনটি ৪৭তম বিজ্ঞান মেলায় প্রদর্শিত হয়েছে এবং এটি বর্তমানের পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিথিনের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উদ্ভাবনের বিস্তারিত তথ্য
কচুর স্টার্চ, পানি, হোয়াইট ভিনেগার এবং গ্লিসারিনের সংমিশ্রণে তৈরি এই পলিথিনটি ব্যবহারের পর পানিতে ফেলে দিলে মাত্র ৫ দিনের মধ্যে মাছের খাদ্যে পরিণত হয়। অন্যদিকে, মাটিতে ফেলে দিলে ১৫ দিনের মধ্যে এটি জৈবসারে রূপান্তরিত হয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো এটিকে পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী করে তুলেছে।
উদ্ভাবনকারী দলের সদস্যরা হলেন দ্বাদশ শ্রেণির লাবিদ ইমরোজ ও আরাফাত রহমান অনিক এবং নবম শ্রেণির মাহদী নূর আহমেদ, এসকে সিজান, ওমর ফারুক রাফি ও আবু হুরাইরা নোমান। তাদের প্রজেক্টের নাম ‘কচু থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন তৈরি’ এবং এটি ‘উদ্ভাবননির্ভর বাংলাদেশ গঠনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত সহায়তা ও উৎপাদন প্রক্রিয়া
কলেজের রসায়ন বিভাগের ইন্সট্রাক্টর আশরাফুল ইসলাম এই দলকে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদান করেছেন। উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এর আগে আলু থেকে পচনশীল পলিথিন উৎপাদন করেও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।
ওমর ফারুক রাফি জানান, কচু ধুয়ে পরিষ্কার করে ছিলে নেওয়ার পর কুচি কুচি করে কেটে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় ১০ মিনিট। তারপর নির্যাস বের করে স্টার্চ সংগ্রহ করা হয়। প্রতি ১০ কেজি কচু থেকে ১৩০০ থেকে ১৬০০ গ্রাম স্টার্চ পাওয়া যায়। এই স্টার্চ ব্যবহার করে এক কেজি কচু দিয়ে ২ ফুট বাই ১ ফুটের ১০টি বড় পলিব্যাগ বা ৩০টি ছোট পলিব্যাগ তৈরি করা সম্ভব।
পরিবেশগত সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
লাবিদ ইমরোজের মতে, বর্তমানে বাজারে থাকা পলিথিন ৪০০-৫০০ বছরেও ধ্বংস হয় না, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাদের উদ্ভাবিত পলিথিনটি বিপরীতে মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং পানিতে মাছের খাদ্য তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শাহাদাত হোসেন উল্লেখ করেন, এই পলিথিনের উৎপাদন খরচ এবং টেকসইতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে পচনশীল হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব এবং তাদের ভাবনা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
বিজ্ঞান মেলার অনুষ্ঠান ও প্রতিক্রিয়া
গৌরীপুরে অনুষ্ঠিত এই বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইন। মেলা দেখতে আসা দর্শকদের মধ্যে সুমাইয়া আক্তার, তাসনিম সুলতানা, আয়েশা আক্তার ও মুমতাহিনা সিদ্দিকার মতো অনেকেই এই উদ্ভাবনে মুগ্ধ হয়েছেন। মুমতাহিনা সিদ্দিকা বলেন, ‘কচু থেকে পলিথিন এই প্রথম শুনলাম ও দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি!’
বিজয়ী প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী
বিজ্ঞান মেলায় জুনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করে নুরুল আমিন খান উচ্চ বিদ্যালয়, দ্বিতীয় স্থান ডক্টর মোহাম্মদ রেজাউল করিম উচ্চ বিদ্যালয় এবং তৃতীয় স্থান গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। সিনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান পায় গৌরীপুর সরকারি কলেজ এবং দ্বিতীয় স্থান গৌরীপুর মহিলা কলেজ।
বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও কুইজ প্রতিযোগিতায়ও বিভিন্ন শিক্ষার্থী পুরস্কার অর্জন করেছেন, যা স্থানীয় শিক্ষা ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।



