১২ হাজার বছরের পুরোনো কঙ্কালে মা-মেয়ের বিরল জিনগত রোগের সন্ধান
১৯৬৩ সালে ইতালির রোমিটো গুহায় ১২ হাজার বছরের বেশি পুরোনো দুটি কঙ্কালের সন্ধান পেয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। দীর্ঘদিন ধরে এই কঙ্কাল দুটি ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে সংরক্ষিত ছিল। তবে আধুনিক জিনতত্ত্বের অগ্রগতির ফলে গবেষকরা এখন নতুন তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। পর্তুগালের ইউনিভার্সিটি অফ কোয়েমব্রার নৃবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ফার্নান্দেজের নেতৃত্বে একটি দল কঙ্কাল দুটির বাঁ কানের ভেতরের অংশ থেকে প্রাচীন ডিএনএ সংগ্রহ করে জেনেটিক বিশ্লেষণ পরিচালনা করেন।
মা ও মেয়ের কঙ্কালে বিরল জিনগত রোগ
গবেষণায় দেখা গেছে, কঙ্কাল দুটি ছিল একজন মা ও তাঁর মেয়ের। বিশ্লেষণে প্রকাশ পেয়েছে যে তাঁরা ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো অ্যাক্রোমেসোমেলিক ডিসপ্লাসিয়া বা এএমডিএম নামক বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগের কারণে তাঁদের উচ্চতা স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। সম্প্রতি দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন এ এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যা বিজ্ঞানী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
রোগের কারণ ও প্রভাব
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এএমডিএম রোগে হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। রোগটি মূলত এনপিআর২ নামক জিনের মিউটেশনের কারণে সৃষ্টি হয়। মেয়েটির শরীরে এই জিনের দুটি ত্রুটিপূর্ণ মিউটেশন থাকার ফলে তাঁর হাড়ের গঠন ও শারীরিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। অন্যদিকে, মা ছিলেন হেটেরোজাইগাস, অর্থাৎ তাঁর জিনে কেবল একটি মিউটেশন ছিল। এর ফলে তাঁর উচ্চতা মেয়ের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও তা স্বাভাবিক মানের চেয়ে কম ছিল।
এএমডিএম রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে মেয়েটির পক্ষে সে সময় শিকার সংগ্রহ, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বা ভারী কাজ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তবে কঙ্কাল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃত্যুর আগে কিশোরী বয়স পর্যন্ত মেয়েটি অন্যদের মতোই পর্যাপ্ত পুষ্টি পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে গবেষক ড্যানিয়েল ফার্নান্দেজ বলেন, "সেই সমাজে তিনি যে বেঁচে ছিলেন, তা প্রমাণ করে যে পরিবার ও গোষ্ঠী তাঁকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করেছিল।"
গবেষণার তাৎপর্য
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে বিরল জিনগত রোগ কোনো আধুনিক সমস্যা নয়। বরং এসব রোগ মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করে আসছে। বেলজিয়ামের লিয়েজ ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের চিকিৎসক অ্যাড্রিয়ান ডালির মতে, এই জিনগত রোগের প্রাচীন ইতিহাস বোঝা বর্তমান সময়ে এ ধরনের জটিল ও বিরল শারীরিক অবস্থাকে শনাক্ত ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই গবেষণা প্রত্নতত্ত্ব ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রাচীন নমুনার বিশ্লেষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।



