পৃথিবীর শীতলতম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় কোনো দেশ নেই। মানুষের স্থায়ী বসতিও নেই বললেই চলে। চরম প্রতিকূল এই মহাদেশে মানুষের বসতি না থাকলেও আছে অসাধারণ কিছু গবেষণাগার। ‘অ্যান্টার্কটিক গবেষণা কেন্দ্র’ নামের এই প্রত্যন্ত ঘাঁটিগুলো সেখানকার কঠোর পরিস্থিতিতেও কাজ করে চলেছে। সেখানে কাজ করেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা।
৭০টির বেশি গবেষণাকেন্দ্র
বিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও অ্যান্টার্কটিকায় ৭০টিরও বেশি গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে। এগুলো পরিচালনা করছে প্রায় ৩০টির বেশি দেশ। এই গবেষণাকেন্দ্রগুলো ছোট ছোট কেন্দ্র থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র শহরের মতো বড় ও স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবেও বিস্তৃত। যেসব দেশ ১৯৬১ সালে অ্যান্টার্কটিকা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, তারাই মূলত এখানে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। ফলে অ্যান্টার্কটিকায় গ্রীষ্মকালে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০। কিন্তু শীতকালে তা নেমে আসে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ জনে।
এখানে যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণাকেন্দ্র আছে। একসময় এসব গবেষণাকেন্দ্রে দর্শনার্থীরা যেতে পারত। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির সময় অ্যান্টার্কটিকার সব গবেষণাকেন্দ্র বাইরের দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর থেকে সেগুলো আর খোলা হয়নি। তবে জাহাজ থেকে এখনো কয়েকটি কেন্দ্র দেখা যায়।
বৃহত্তম গবেষণাকেন্দ্র ম্যাকমার্ডো স্টেশন
অ্যান্টার্কটিকার গবেষণাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়গুলোর একটি হলো এনএসএফ ম্যাকমার্ডো স্টেশন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সাহায্যে পরিচালিত হয়। রস সাগরের রস দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে হাট পয়েন্ট উপদ্বীপে এটি অবস্থিত। সেখানকার কর্মীদের কাছে এটি ম্যাকটাউন নামে পরিচিত। এখানে ১ হাজারের বেশি কর্মী থাকতে পারেন। ১৯৫০-এর দশকে চালু হওয়া এই ঘাঁটিতে গবেষণাগার, ছাত্রাবাস, বিমানঘাঁটি এবং দোকানের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। ছোট্ট শহরের মতো স্টেশনটির নিজস্ব পারমাণবিক চুল্লি নুকি পু ১৯৭২ সালে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
কনকর্ডিয়া স্টেশন: সবচেয়ে প্রত্যন্ত গবেষণাকেন্দ্র
আরেকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা কেন্দ্র কনকর্ডিয়া স্টেশন। এটি ফ্রান্স ও ইতালির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয় এবং অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে প্রত্যন্ত গবেষণা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার মালভূমির উঁচু স্থান ডোম সি নামক জায়গায় ৩ হাজার ২৩৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। ফলে চরম আবহাওয়ার দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম কঠিন একটি গবেষণাকেন্দ্র। কনকর্ডিয়ায় পৌঁছানোর জন্য উচ্চতা ও ঠান্ডা মোকাবিলার উপযোগী বিশেষ বিমানের প্রয়োজন হয়। শীতকালে কনকর্ডিয়ায় তাপমাত্রা এতই কমে যায় যে, একে দেখে ভিন্ন কোনো গ্রহ মনে হয়। তখন নেমে যেতে পারে তাপমাত্রা মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্র
অ্যান্টার্কটিকার অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে আছে রাশিয়ার ভস্তক স্টেশন। পৃথিবীতে রেকর্ড করা সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাইনাস ৮৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল এই স্টেশনেই। আবার তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় থেকে অ্যান্টার্কটিকায় বিচরণকারী দেশ ইউক্রেনের ভার্নাডস্কি গবেষণা কেন্দ্র দীর্ঘ সময় ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। নিউজিল্যান্ডের প্রধান অ্যান্টার্কটিক কেন্দ্র হিসেবে আছে স্কট বেস। স্যার এডমন্ড হিলারির নেতৃত্বে অ্যান্টার্কটিকা অতিক্রমে সহায়তা করার জন্য নির্মিত হয়েছিল এই ঘাঁটি।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিও গবেষণাকাজের জন্য প্রেসিডেন্ট এডুয়ার্ডো ফ্রেই মন্টালভা বেস নামে একটি গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করেছে। আরেকটি দেশ আর্জেন্টিনাও এস্পেরানজা বেস নামে গবেষণাকেন্দ্র চালু করেছিল ১৯৫০-এর দশকে। তখন থেকে সেখানে বিভিন্ন পরিবার, একটি স্কুল এবং অ্যান্টার্কটিকায় নথিভুক্ত প্রথম জন্মগ্রহণের ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরও অনেক দেশের গবেষণা কেন্দ্র আছে এখানে।
গবেষণার বিষয়বস্তু
বরফের দেশে চরম আবহাওয়ায় এসব গবেষণা কেন্দ্রে কী হয় কিংবা কী নিয়ে গবেষণা হয়, তা নিয়ে কৌতূহলী হওয়া স্বাভাবিক। আসলে এখানে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করা হয়। এখানকার গবেষকেরা জলবায়ু পরিবর্তন, বরফের কোর, বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান এবং মহাকাশের মতো বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন।
অ্যান্টার্কটিক স্টেশনগুলোতে পরিচালিত গবেষণা ওজোন স্তরের ছিদ্র আবিষ্কারে সাহায্য করেছিল, যা পরিবেশগত ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্য। এখানে জলবায়ু নিয়ে অধিক গবেষণা করা হয়। বিজ্ঞানীরা বরফের গভীরে খনন করে আইস কোর সংগ্রহ করেন, যা অনেকটা টাইম ক্যাপসুলের মতো। এই কোরগুলোতে হাজার হাজার, এমনকি লাখ লাখ বছর আগে আটকে থাকা ক্ষুদ্র বায়ু বুদবুদ থাকে। এগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা অতীতের তাপমাত্রা, গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন। কনকর্ডিয়া স্টেশনে গবেষকেরা ১০ লাখ বছরেরও বেশি পুরোনো বরফের কোর খনন করার একটি প্রকল্পের সাফল্যের কথা ঘোষণা করেছেন।
অ্যান্টার্কটিকায় হিমবাহবিদেরা বরফের চাদর ও হিমবাহ কীভাবে চলাচল করে, গলে যায় এবং সমুদ্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তা নিয়েও গবেষণা করেন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে গেলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। তা ছাড়া চরম পরিবেশে প্রাণীরা কীভাবে বেঁচে থাকে, তা নিয়েও গবেষণা হয়।
মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা
অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণার অন্যতম বিষয় মহাকাশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান। যেহেতু অ্যান্টার্কটিকার আকাশ পরিষ্কার, আর্দ্রতা কম এবং আলোক দূষণ নগণ্য, তাই এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য পৃথিবীর অন্যতম সেরা স্থান। যুক্তরাষ্ট্রের আমুন্ডসেন-স্কট দক্ষিণ মেরু স্টেশন, ফ্রান্স-ইতালির কনকর্ডিয়া স্টেশনসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে এ বিষয়ে গবেষণা হয়।
তবে রাশিয়ার ভস্তক স্টেশনে করা গবেষণা বিশ্বজুড়ে বেশ বিখ্যাত। কেননা এটি ভস্তক হ্রদের কাছে অবস্থিত। হ্রদটি কেন্দ্রীয় অ্যান্টার্কটিক বরফ চাদরের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার মিটার নিচে অবস্থিত। স্বাদুপানির এই হ্রদ দেড় কোটি বছর ধরে বিশ্বের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে মনে করা হয়। পৃথিবীর গভীর ও জটিল ইতিহাস বোঝার জন্য এটি গবেষণার একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।



