গণিতবিদ ফ্র্যাঙ্ক মার্লে: নন-লিনিয়ার জগতের পাগলামিকে বশে আনার যোদ্ধা
আমাদের এই বিশ্ব কি সত্যিই সুশৃঙ্খল? গণিতবিদ ফ্র্যাঙ্ক মার্লের মতে, মোটেও না! তাঁর দৃষ্টিতে, এই জগৎটা একেবারে পাগলাটে এবং অনিয়মে ভরা। মার্লে এই বিশৃঙ্খল প্রকৃতিকে অঙ্কের ভাষায় বশে আনার চেষ্টা করছেন, যা তাঁকে ২০২৬ সালে ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন ম্যাথমেটিকস এনে দিয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
নন-লিনিয়ার সিস্টেম: সামান্য পরিবর্তনে বিশাল প্রভাব
মার্লের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হলো নন-লিনিয়ার বা অসরলরৈখিক সিস্টেম। এই সিস্টেমগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ছোট্ট একটি পরিবর্তনও বিশাল ও অপ্রত্যাশিত ফলাফল ডেকে আনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শান্ত বাতাস কীভাবে হঠাৎ করে ভয়ংকর টর্নেডোতে পরিণত হয়, তা নন-লিনিয়ার গণিতের মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। সাধারণ গণিতের সরল সমীকরণের বিপরীতে, প্রকৃতির বেশিরভাগ সমীকরণই এই জটিল পথ অনুসরণ করে, যেখানে হঠাৎ করেই শূন্য থেকে লাফ দিয়ে অসীমে পৌঁছে যাওয়ার ঘটনা, যাকে সিঙ্গুলারিটি বা ব্লো-আপ বলে, সাধারণ ব্যাপার।
সলিটন: বিশৃঙ্খলার মাঝে লুকানো সরলতা
মার্লের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সলিটন ধারণার ব্যবহার। নন-লিনিয়ার সিস্টেমের চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেও সলিটনগুলো নিজেদের আকার ও শক্তি ধরে রেখে টিকে থাকে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, প্রকৃতির যেকোনো জটিল সিস্টেমকে অসংখ্য সলিটনের সমন্বয় হিসেবে দেখা যায়, যা বিশাল বিশৃঙ্খলার আড়ালে অদ্ভুত এক সরলতা লুকিয়ে রাখে। এই ধারণা তাঁকে লেজার আলো, তরল পদার্থ এবং কোয়ান্টাম মেকানিকসের সমীকরণগুলোর ব্লো-আপ বুঝতে সাহায্য করেছে।
সাক্ষাৎকারে মার্লের অন্তর্দৃষ্টি
সায়েন্টিফিক আমেরিকান সাময়িকীর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মার্লে তাঁর পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু নন-লিনিয়ার কাঠামোর দিকেই মনোযোগ দিয়েছিলাম, যখন অন্যান্য বিজ্ঞানীরা লিনিয়ার বিষয় দিয়ে শুরু করতেন।’ এই পদ্ধতিই তাঁকে সলিটন আবিষ্কারে পরিচালিত করে, যা নন-লিনিয়ার সমীকরণের বিশেষ সমাধান হিসেবে কাজ করে এবং নিজের শক্তিকে অসীমে ছুড়ে না ফেলে আটকে রাখে।
লেজারের ক্ষেত্রে, মার্লে প্রমাণ করেছেন যে নির্দিষ্ট শর্তে সমীকরণের ব্লো-আপ ঘটতে পারে, যা লেজারকে বেশি ফোকাসড করে তোলে। অন্যদিকে, তরল পদার্থের নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণে, তিনি দেখিয়েছেন যে ঘর্ষণ ব্লো-আপ রোধ করতে পারে না, যা টার্বুলেন্স বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোয়ান্টাম মেকানিকসের শ্রোডিঙ্গার সমীকরণের নন-লিনিয়ার রূপ নিয়েও তাঁর কাজ উল্লেখযোগ্য, যেখানে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে সিঙ্গুলারিটি সময়ের সাথে মিলিয়ে যায়, কিন্তু শেষমেশ উল্টো ফলাফল পেয়েছেন।
পুরস্কার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ব্রেকথ্রু প্রাইজ জয় মার্লের জন্য একটি বড় সম্মান, যা তাঁর অগ্রগামী কাজকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি মনে করেন, গণিতের মাধ্যমে প্রকৃতির গোপন নিয়ম উন্মোচন করা সম্ভব, এবং সলিটনের মতো সরল ধারণাগুলোই জটিলতা বুঝার চাবিকাঠি। তাঁর গবেষণা ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে, বিশেষ করে জটিল সিস্টেম নিয়ন্ত্রণে।



