ভর আসলে কী? হিগস ফিল্ড থেকে শক্তি, বিজ্ঞানের চমকপ্রদ ব্যাখ্যা
ভর আসলে কী? হিগস ফিল্ড থেকে শক্তি, বিজ্ঞানের চমকপ্রদ ব্যাখ্যা

ছোটবেলায় আমরা পড়েছি, যার ভর আছে এবং জায়গা দখল করে, সেটাই পদার্থ বা বস্তু। অর্থাৎ ভর বস্তুর একটা মৌলিক ধর্ম। কিন্তু ভর জিনিসটা আসলে কী? বস্তুর ভর ঠিক কোত্থেকে আসছে? যাঁদের একটু বিজ্ঞান নিয়ে জানাশোনা আছে, তাঁরা বলবেন, পদার্থের ভর আসে মূলত হিগস ফিল্ডের সঙ্গে বিভিন্ন মৌলিক কণার মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। সত্যিই কি তা–ই? হিগস ফিল্ড বা ক্ষেত্র থেকে বস্তু যে ভর পায়, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই—এটুকু প্রমাণিত। তবে চারপাশের সবকিছুর ভর কোথা থেকে আসছে, সেই উত্তর শুধু হিগস ফিল্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাস্তবতা আরও বেশি মজার।

হিগস ফিল্ডের জন্ম ও ইলেকট্রোউইক তত্ত্ব

১৯৬০-এর দশকে হিগস ক্ষেত্র তত্ত্বের জন্ম হয় আরেকটি জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে বাঁচানোর জন্য। পদার্থবিদেরা সে সময় মৌলিক বল সম্পর্কে একটি তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন। তাতে বলা হয়, বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় বল এবং দুর্বল নিউক্লিয়ার বল আসলে একটি মৌলিক বলেরই ভিন্ন দুটি রূপ। একক এই মৌলিক বলের নাম দেওয়া হয়েছে ইলেকট্রোউইক ফোর্স বা দুর্বল তড়িৎ বল। বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব, আলোসহ রসায়নের অনেক কিছুর নেপথ্যের কারিগর বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় বল। অন্যদিকে দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের কারণে নির্দিষ্ট ধরনের বিকিরণ সংগঠিত হয়।

অনেকটা বরফ ও জলীয় বাষ্পের মতো বিষয়। দুটিই পানি থেকে তৈরি, কিন্তু বৈশিষ্ট্য আলাদা। বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় বল এবং দুর্বল নিউক্লিয়ার বলও অনেকটা তেমনই। একই জিনিসের আলাদা পরিচয়, আলাদা রূপ। সব ঠিকই ছিল, কিন্তু এক জায়গায় গোলমাল দেখা দেয়। দুর্বল তড়িৎ বলের তত্ত্ব অনুযায়ী, সব উপপারমাণবিক কণার ভর শূন্য (প্রচলিত বাংলায় সাবঅ্যাটমিক পার্টিকেলকে ‘অতিপারমাণবিক কণা’ বলা হয়, তবে এর সঠিক উপপারমাণবিক কণা)।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিন্তু এটা তো সম্ভব নয়। সেই ১৯৩০-এর দশকেই এ দাবি ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। কারণ, সব উপপারমাণবিক কণা কোনোভাবেই ভরশূন্য হতে পারে না। ইলেকট্রোউইক বল নিয়ে বিজ্ঞানীরা তখন একটু বিপাকেই পড়ে গেলেন। বলা যায়, জন্মের আগেই বাতিল হওয়ার মতো অবস্থা। এ সময় পিটার হিগস, ফঁসোয়া এংলার্টসহ অন্য বিজ্ঞানীরা হিগস ফিল্ডের ধারণা নিয়ে এলেন। হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ালে কোনো বস্তু বা কণা ভরপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু সব উপপারমাণবিক কণা এ ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় না।

ব্যস, সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। হিগস ক্ষেত্র তত্ত্ব থেকে একধরনের কণা থাকার কথা অনুমান করা হয়েছিল, যাকে বলা হলো হিগস বোসন কণা। নোবেলজয়ী পদার্থবিদ লিওন লেডারম্যান ও সাংবাদিক ডিক টেরেসি একটা বই লিখেছিলেন সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের কাছে বিজ্ঞানের গুরুত্ব তুলে ধরতে। সেই বইয়ের খটোমটো নাম প্রকাশক মেনে নেননি। বিরক্ত লেডারম্যান তখন বইয়ের নাম বদলে রাখেন দ্য গড-ড্যাম পার্টিকেল। প্রকাশক পরে এ নাম বদলে দেন দ্য গড পার্টিকেল। সেই থেকে হিগস বোসনের নাম হয়ে গেল গড পার্টিকেল বা ঈশ্বরকণা। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ২০১২ সালে ইউরোপের দ্য ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা সার্নে বিজ্ঞানীরা হিগস বোসনের দেখা পান। এ কারণে অবশেষে পুরোপুরি বেঁচে গেল ইলেকট্রোউইক তত্ত্ব।

হিগস ফিল্ডের সীমাবদ্ধতা

হিগস ফিল্ড কিছু উপপারমাণবিক কণাকে ভরের জোগান দেয়, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের অতি পরিচিত ইলেকট্রন এ দলে পড়ে। প্রোটন বা নিউট্রনের মধ্যে থাকা কোয়ার্ক কণাগুলো ভর পায় এই হিগস ফিল্ডের কারণেই—এ সবই সত্য। আর এ কারণেই বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষেরা ভরের কথা উঠলেই সবার আগে হিগস ফিল্ডের কথা ভাবেন।

যা–ই হোক, হিগস তত্ত্বের কল্যাণে উপপারমাণবিক কণার ভরশূন্য হওয়ার বিষয়টি সে সময় টিকে যায়। তবে আমাদের সবটা ভরের রহস্যের সমাধান হয় না এ থেকে। উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক, একজন মানুষের ওজন (আসলে ভর) ১০০ কেজি। এখন আপনি যদি কোনো রসায়নবিদকে প্রশ্ন করেন, এই ভরের উৎস কী? বড় সম্ভাবনা আছে, তিনি অণুর কথা বলবেন। আমাদের দেহ যেহেতু বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য অণু দিয়ে গঠিত, তাই সেখান থেকে দেহের ভর হবে সব অণুর ভরের যোগফলের সমান। বৈজ্ঞানিকভাবে এ উত্তরের মধ্যে কোনো ভুল নেই। আমরা ওই মানুষের দেহের প্রতিটা অণু আলাদা করে মাপতে পারলে দেখব, সেখানে ওজন হয়েছে ১০০ কেজি। অণুকে ভাগ করে পরমাণু পাওয়া যায়। এবার যদি দেহের সব পরমাণুর ভর মাপি, তাহলে দেখব, সেখানেও পরমাণুর সমষ্টিগত ভর ১০০ কেজি। অর্থাৎ দেহের ভর পরমাণু থেকে আসে, এ কথাও সত্যি।

সমস্যা বাধে এর চেয়ে গভীরে ডুব দিলে। আমরা জানি, পরমাণুকে ভাগ করা যায়। পরমাণুর একদম কেন্দ্রে থাকে প্রোটন আর নিউট্রন। এর বাইরে পরমাণুর প্রায় ৯৯ ভাগজুড়ে ছড়িয়ে থাকে ইলেকট্রন। প্রোটন ও নিউট্রনের চেয়ে ইলেকট্রনের ভর অতি নগণ্য। প্রোটন-নিউট্রন কণার মাত্র ০.০৫ শতাংশ। অতিসামান্য এই ভর হিসাবের সুবিধার জন্য আমরা আপাতত অগ্রাহ্য করতে পারি। শুধু প্রোটন আর নিউট্রনের ভর আলাদাভাবে মেপে যোগ করলে দেখব, ভর হয়েছে মাত্র ৯৯.৯৫ কেজি। চিন্তার কারণ নেই। বাকি ০.০৫ কেজি সেই ইলেকট্রনগুলোর ভর।

কোয়ার্কের ভর ও শক্তির রূপান্তর

এ পর্যায়ে এসে সব ঠিকঠাকই লাগছে। দেখা যাচ্ছে, মানুষের ভর তার ভেতরের উপপারমাণবিক কণা থেকেই আসে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে অবশ্য উপপারমাণবিক কণাই শেষ কথা নয়। নিউট্রন ও প্রোটন তৈরি হয় মৌলিক কণা কোয়ার্ক দিয়ে। ভরের খোঁজে এবার কোয়ার্কগুলোকে ওজন করে দেখা যাক। এখন পর্যন্ত এটাই আমাদের অস্তিত্বের শেষ সীমা। কোয়ার্কের সম্মিলিত ভর যদি ৯৯.৯৫ কেজি হয়, তবে আমরা বলতে পারব, আমাদের ভর আসে কোয়ার্ক থেকে।

না, আমরা হাতে–কলমে কোয়ার্ক ধরতে পারি না। শক্তিশালী কণাত্বরক যন্ত্রের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই এর বৈশিষ্ট্য—ভর মেপেছেন। ফার্মিল্যাবের জ্যেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী ও লেখক ডন লিংকন ১৯৯৫ সালে টপ কোয়ার্ক, ২০১২ সালে হিগস কণা আবিষ্কারক দলের সদস্য ছিলেন। তাঁর একটি লেখায় তিনি আমাদের কোয়ার্কের ভরটি বলে দিয়েছেন। কী ভাবছেন? আবারও আমরা ৯৯.৯৫ কেজি ভর পাব?

একদমই না। ১০০ কেজি ওজনের মানুষের দেহে যত কোয়ার্ক আছে, সেসবের ভর হবে মাত্র ২ কেজির মতো! পুরো দেহের ভরের মাত্র ২ শতাংশ! এর সঙ্গে সঙ্গে চাইলে ইলেকট্রনের ভরও যোগ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রেও ২.০৫ শতাংশের বেশি হবে না। বাকি ৯৭.৯৫ শতাংশ ভর তাহলে কোত্থেকে আসে?

মজাটা এখানেই। উত্তরটা জটিল নয়। শ খানেক বছর আগে আইনস্টাইন আমাদের উত্তরটা দিয়ে গেছেন তাঁর বিখ্যাত ভর-শক্তি সমীকরণের মাধ্যমে। তিনি লিখেছিলেন, E=mc2, যেখানে E মানে এনার্জি বা শক্তি, m মানে ভর আর c হলো আলোর বেগ। এই সমীকরণ আমাদের বলে, ভর ও শক্তি সমতুল্য এবং একটিকে আরেকটিতে রূপান্তর করা সম্ভব। কিন্তু এটা আমাদের প্রশ্নের উত্তরে কীভাবে সাহায্যে করবে?

নিউটন প্রোটনের ভেতর কোয়ার্ক কিন্তু স্থির বসে থাকে না। প্রচণ্ড গতিতে ছোটাছুটি করে সারাক্ষণ। এমনকি এই গতি আলোর গতির একেবারে কাছাকাছিও চলে যায়। আইনস্টাইনের সূত্র বলছে, প্রচণ্ড গতি মানেই প্রচণ্ড শক্তি। এখান থেকে অবশ্য ভরের বিষয়টি পরিষ্কার হয় না। আরও কিছু ঘটনা আছে।

প্রোটন আর নিউট্রন আসলে অতিক্ষুদ্র গোলকের মতো। ১ মিটারের ১০১৫ ভাগের এক ভাগ ব্যাসের গোলক। এত ক্ষুদ্র জায়গায় যদি প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন কোয়ার্ক ছোটাছুটি করে, তাহলে সেখানে সমপরিমাণ আরেকটি শক্তিশালী বল থাকার কথা, যেটা কোয়ার্ককে ধরে রাখবে।

যে ধনুকের দড়ি যত শক্ত করে বাঁধা হয়, সে ধনুকের শক্তি তত বেশি হয়। আবারও বলি, শক্তিশালী বল মানেই উচ্চশক্তি। ধনুক এর একটি চমৎকার উদাহরণ। যে ধনুকের দড়ি যত শক্ত করে বাঁধা হয়, সে ধনুকের শক্তি তত বেশি হয়।

এবার কোয়ার্কের গতিশক্তি এবং নিউট্রন–প্রোটনের ভেতরে কোয়ার্ককে ধরে রাখার শক্তি যোগ করে সেটা ভরে রূপান্তর করলে দেখব, দেহের ওজনের যে হিসাবটা এতক্ষণ মিলছিল না, সেটা মিলে গেছে। অর্থাৎ সচরাচর আমরা যেটা ভাবি যে ভর কোনো ত্রিমাত্রিক বস্তু থেকে আসে, দেখা যাচ্ছে তা সব সময় সত্যি নয়। বরং ভরের বেশির ভাগটা আসে শক্তি থেকে। এটা শুধু আমাদের দেহের ক্ষেত্রে নয়, সব বস্তুর ভরই আসে শক্তি থেকে।

উপসংহার

অপবিজ্ঞানে অনেক সময় বলা হয়, আমরা সবাই আসলে শক্তির ভিন্নরূপ। খুব দুর্বলভাবে কথাটা সত্যি বলা যায়। কেউ কেউ এর সঙ্গে আবার মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্পও তৈরি করতে পারেন। অপবিজ্ঞানে এসব জিনিস হয়।

তবে এখানকার মূল বিষয় হলো আমাদের ভর অতিক্ষুদ্র উপপারমাণবিক কণার গতিশক্তি এবং এদেরকে ধরে রাখার শক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। আর এটা পদার্থ ও শক্তি নিয়ে ভিন্নভাবে চিন্তার খোরাক জোগায়। ভেবে বিস্মিত হই আমরা। এ জন্যই হয়তো বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, বাস্তবতা কল্পনার চেয়েও অনেক অদ্ভুত।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: বিগ থিংক, ডন লিংকন ডটকম, উইকিপিডিয়া

*লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত