শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করছে সরকার, প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত সব স্তরে বেড়েছে বৃত্তির অর্থ
দেশের প্রান্তিক ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বর্তমান বাজারমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে বাস্তবায়িত হবে। এই পদক্ষেপের ফলে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মাসিক টাকার পরিমাণ ও এককালীন অনুদান আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
দীর্ঘ ১০ বছর পর বৃত্তির হার পুনর্নির্ধারণ
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (মাধ্যমিক-১) মো. সাইদুর রহমানের মতে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি পর্যালোচনা সভায় দেশের সব ধরনের শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করার বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতের সব স্তরের শিক্ষাবৃত্তির হার নির্ধারণ করা হয়েছিল, অর্থাৎ দীর্ঘ ১০ বছর পর এই হার পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় ১৮৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩৬৮ কোটি ১৬ লাখ টাকায় দাঁড়াবে বলে জানানো হয়েছে। এই অর্থ বরাদ্দ অর্থ বিভাগের বাজেট সাপেক্ষে করা হবে, যা শিক্ষা খাতে ঝরে পড়ার হার কমাতে এবং মেধাবীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
বৃত্তির হার বৃদ্ধির বিস্তারিত তথ্য
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) খসড়া প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বিভিন্ন স্তরে বৃত্তির মাসিক হার ও এককালীন অনুদান দ্বিগুণ করা হবে। উদাহরণস্বরূপ:
- প্রাথমিক স্তরে মেধাবৃত্তির হার মাসিক ৩০০ থেকে বেড়ে ৬০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ২২৫ থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকা হবে।
- জুনিয়র (জেএসসি) মেধাবৃত্তি ৪৫০ থেকে বেড়ে ৯০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৩০০ থেকে বেড়ে ৬০০ টাকা হবে।
- এসএসসির মেধাবৃত্তি মাসিক ৬০০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৩৫০ থেকে বেড়ে ৭০০ টাকা হবে।
- এইচএসসির মেধাবৃত্তির মাসিক হার ৮২৫ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তির হার ৩৭৫ থেকে বেড়ে ৭৫০ টাকা হবে।
- স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের মেধাবৃত্তি ১ হাজার ১২৫ থেকে বেড়ে ২ হাজার ২৫০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৪৫০ থেকে বেড়ে ৯০০ টাকা হবে।
এছাড়াও, মাসিক বৃত্তির পাশাপাশি বার্ষিক এককালীন অনুদানের পরিমাণও দ্বিগুণ করা হচ্ছে। যেমন, প্রাথমিকে মেধাবৃত্তি ও সাধারণ বৃত্তির ক্ষেত্রে বার্ষিক এককালীন অনুদান ২২৫ থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকা হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শিক্ষামন্ত্রী মিলন বাসসের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বলেন, ‘বর্তমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মিল রেখে আমরা দেশের প্রাথমিক বৃত্তি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতকসহ সকল স্তরের শিক্ষাবৃত্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। অর্থ বিভাগের কাছে এ বিষয়ে বরাদ্দ চাওয়া হবে। বরাদ্দ প্রাপ্তির পর আমরা শিক্ষার্থীদের বৃত্তির হার বাড়াতে পারব।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫৯ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্রোতধারায় ধরে রাখতে এই সংখ্যা বৃদ্ধির চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
বিশেষ ক্যাটাগরির বৃত্তি ও অন্যান্য উদ্যোগ
সাধারণ বৃত্তি ছাড়াও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, উপজাতি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক এবং পেশামূলক উপবৃত্তির ক্ষেত্রেও এই বর্ধিত হার কার্যকর করা হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও তাদের আওতাধীন বৃত্তির সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ করার প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।
মাউশি অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিভিন্ন স্তরে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাথমিক (পিএসসি) স্তরে মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন, জুনিয়র স্তরে মোট ৪৬ হাজার ২০০ জন, মাধ্যমিক (এসএসসি) স্তরে ২৫ হাজার ৫০০ জন, উচ্চমাধ্যমিকে (এইচএসসি) মোট ১০ হাজার ৫০০ জন এবং উচ্চশিক্ষা (স্নাতক ও অন্যান্য) মিলে বিশেষ ক্যাটাগরিতে প্রায় ৪ হাজার ৯৫৯ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছেন।
সরকারের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার মান সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে এবং তাদের পড়াশোনায় আরও অনুপ্রাণিত করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



