বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পদোন্নতি সংকট: কর্মবিরতি ও শাটডাউনের হুমকি
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের দাবিতে কর্মবিরতি ও পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক শাটডাউনের ঘোষণা দিয়েছেন সংক্ষুব্ধ শিক্ষকেরা। সোমবার সন্ধ্যায় ১০২ জন শিক্ষকের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার তারা কর্মবিরতি পালন করবেন এবং এরপরও দাবি আদায়ে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বুধবার থেকে পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক শাটডাউন কার্যকর করা হবে।
আন্দোলনের পটভূমি ও অনশন কর্মসূচি
এই সিদ্ধান্তের আগে গত রোববার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ শিক্ষকের পদোন্নতির দাবিতে বেঁধে দেওয়া পাঁচ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর সহযোগী অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন। তিনি মৃত্তিকা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। জামাল উদ্দিন রোববার সন্ধ্যা সাতটায় অনশন শুরু করে ২৩ ঘণ্টা অনশনে থাকার পর সোমবার বিকেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অসুস্থতার কারণে তিনি অনশন ভাঙেন।
ইউজিসির নির্দেশনা ও আইনি জটিলতা
পদোন্নতির জন্য আন্দোলনরত শিক্ষকেরা জানান, সমসাময়িক সময়ে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এত দিন একাডেমিক কার্যক্রম, ভর্তি, পরীক্ষা, ডিগ্রি প্রদান এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসংক্রান্ত সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক জারি করা একটি নির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয়টির সামগ্রিক কার্যক্রমে গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
ইউজিসির ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় আইনের আওতায় চাকরি, পেনশন, পদোন্নতি ও অন্যান্য বিধিবিধান সংশোধন ও প্রণয়ন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ উপাচার্য ও সিন্ডিকেটের অনুমোদন নিতে হবে। পরবর্তী সময়ে অনুমোদিত সংবিধির ভিত্তিতেই পদোন্নতি কার্যকর করা হবে। শিক্ষকেরা বলছেন, এই নির্দেশনার ফলে একটি গুরুতর আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৩৫ ও ৩৭ ধারায় উল্লিখিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য উপাচার্যের অনুমোদিত সংবিধি ও বিধি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এমন অনুমোদিত কাঠামো বর্তমানে বিদ্যমান নেই। ফলে শুধু পদোন্নতি নয়, বরং ভর্তি ও পরীক্ষা কার্যক্রম সবকিছুরই আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে।
শিক্ষকদের অবস্থান ও দাবি
বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবদুল কাইউম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫টি বিভাগের বেশির ভাগেই মাত্র তিন–চারজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। অনুমোদিত ৪০১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে রয়েছে ২৬৬টি পদ। এর মধ্যে ৫১ জন শিক্ষক দীর্ঘদিন শিক্ষা ছুটিতে আছেন। খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ভাতা দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, “দ্রুত সময়ের মধ্যে উপাচার্যের অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় সংবিধি ও বিধি প্রণয়ন করে এই আইনি জটিলতার অবসান ঘটাতে হবে। যদি না হয় তবে শিক্ষকেরা একাডেমিক কার্যক্রমে আগামীকাল থেকে কর্মবিরতি পালন করবেন। এরপরও কোনো সুরাহা না হলে পরের দিন বুধবার থেকে পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক শাটডাউনসহ সব প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।”
পদোন্নতিপ্রত্যাশী সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক মোস্তাকিম মিয়া বলেন, “আমাদের দাবি দীর্ঘদিনের। আজ আমরা সব বিভাগের শিক্ষকেরা একটা সাধারণ সভার আয়োজন করি। সেখান থেকেই আমরা এই কর্মবিরতি ও পরবর্তী সময়ে শাটডাউন কর্মসূচির সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” পদোন্নতিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের মধ্যে আছেন ২৪ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৩০ জন সহকারী অধ্যাপক এবং ৬ জন প্রভাষক। তাঁদের ভাষ্য, বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব পাওয়ার পর গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে পদোন্নতি বোর্ড গঠন করেন। এরপর দুটি সিন্ডিকেট সভা হলেও উপাচার্য নিয়োগ বোর্ড অনুমোদনের প্রস্তাব সিন্ডিকেটে তোলেননি। সর্বশেষ গত ৩১ মার্চ সিন্ডিকেট সভা হয়।
উপাচার্যের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. তৌফিক আলম জানান, যে নিয়মে শিক্ষকেরা পদোন্নতি চাচ্ছেন, তাতে ইউজিসির আপত্তি আছে। ইউজিসি বলেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিন্ন নীতিমালায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি দিতে হবে। ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত পত্র দিয়েছে ইউজিসি। তিনি বলেন, “অভিন্ন নীতিমালা দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করেছে। যে তিনটি করেনি, তার মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। আমরা এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ করছি। এটা হয়ে গেলে শিক্ষকেরা যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি পাবেন।”
শিক্ষকেরা ঘোষণা দিয়েছেন, সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ‘বিধি-সংবিধিহীন’ কোনো একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চান না। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।



