জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: পরিবর্তনের ছোঁয়া, চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: পরিবর্তনের ছোঁয়া, চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: পরিবর্তনের ছোঁয়া, চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল কৃত্রিম আসনসংকট। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরও নেতা-কর্মীরা আসন দখলে রেখে রাজনৈতিক ব্লক তৈরি করতেন। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ গণরুমেই কাটাতে হতো। রাজনৈতিক বিবেচনায় আসন বণ্টনের কারণে কখনো কখনো চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরাও নিজের একটি আসন পেতেন না।

গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগের মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা হল ছাড়ায় কৃত্রিম আসনসংকট দূর হয়েছে। বর্তমানে ২১টি আবাসিক হলে হল সংসদের নেতাদের সহায়তায় আসন বণ্টন করা হচ্ছে। কয়েক মাস পরপর পড়াশোনা শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকা করে হল ছাড়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

র্যাগিং সংস্কৃতি বিলোপ

গত কয়েক বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আসন দখল, গণরুম, গেস্টরুম সংস্কৃতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। গণ-অভ্যুত্থানের পর আবাসনসংকট, র্যাগিং বা গেস্টরুমের মানসিক নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীরা জানান, ছাত্রলীগ সক্রিয় থাকাকালে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছে গণরুম ও গেস্টরুম ছিল আতঙ্কের নাম। রাত হলেই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের গণরুমে কান ধরে ওঠবস করানো, লাফানো, মুরগি বানিয়ে রাখা হতো। কখনো কখনো মারধর করে কান ফাটানোর ঘটনাও ঘটেছে। তবে বর্তমানে এই সংস্কৃতি বিলোপ হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-বেরুনী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তৌহিদ সিয়াম বলেন, গণরুমে নির্যাতনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অনুগত জুনিয়র তৈরি এবং রাজনীতিতে যুক্ত করা। এখন সে অবস্থা নেই। হলগুলোর অতিথি কক্ষে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে আড্ডা, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি কিংবা গ্রুপ স্টাডি করতে পারেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি আবেদা সুলতানা বলেন, বর্তমানে কোনো হলেই গণরুম সংস্কৃতি নেই। সব শিক্ষার্থী নিজস্ব সিটে থাকেন। সামনে আর কখনো এ ধরনের গণরুমের ব্যবস্থা সৃষ্টি হবে না বলে আশাবাদী তিনি।

নারী হেনস্তা ও মোরাল পুলিশিং

ক্যাম্পাসে নারী হেনস্তা ও মোরাল পুলিশিংয়ের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ ১২ মে রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ফজিলতুন্নেছা হলসংলগ্ন সড়ক থেকে এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহভাজন একজনের চেহারা নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরদিন ১৩ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় হত্যাচেষ্টা ও ধর্ষণচেষ্টার মামলা করে।

এ ঘটনার পর আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

রোকেয়া হলের এক ছাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'গরমের দিনে রাতে কোথাও নিরিবিলি জায়গায় বাতাসের জন্য বসে থাকলে বাইকে করে অনেকে এসে কটূক্তি করে চলে যায়। রাতে ছেলেমেয়ে একসঙ্গে বসে থাকলে বাজে ভাষায় আক্রমণ করে। ইদানীং এ ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে।'

এর আগে পয়লা বৈশাখে এক নির্মাণশ্রমিক নারীদের আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে আটক হন। তাঁর মুঠোফোন ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি কয়েক মাস ধরে এমন ভিডিও করছিলেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মিত কোর্সের দুই শিক্ষার্থী বটতলা এলাকায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের গোপনে ছবি তুলতে গিয়ে আটক হন। শিক্ষার্থীদের একটি চক্র রাত হলেই মোরাল পুলিশিং করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নির্মাণশ্রমিকদের বিষয়টি প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। মোরাল পুলিশিংয়ের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিকিৎসাকেন্দ্র ও খাবারের নিম্নমান

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য একটি চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যেকোনো রোগের ওষুধ হিসেবে প্যারাসিটামল দেওয়া হতো, ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে মেডিক্যালের নাম দিয়েছিলেন 'নাপা সেন্টার'। জাকসু নির্বাচনের সময় বেশির ভাগ প্রার্থী চিকিৎসাকেন্দ্রের উন্নয়ন ও ডাইনিং-ক্যানটিনের খাবারের ভর্তুকি আদায়ের আশ্বাস দিয়েছিলেন। চিকিৎসাকেন্দ্রে কিছুটা পরিবর্তন এলেও আশানুরূপ পরিবর্তন হয়নি।

চিকিৎসাকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, আগে ১০ থেকে ১২ রকমের ওষুধ পাওয়া যেত, এখন ৮০ প্রকারের বেশি ওষুধ রয়েছে। আগে ১৩ জন চিকিৎসক সেবা দিতেন, এখন খণ্ডকালীন চিকিৎসকের সংখ্যা সাতজন বাড়ানো হয়েছে। তবে রাত আটটার পর কোনো নারী চিকিৎসক থাকেন না। ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাদিয়া রহমান বলেন, 'যেকোনো সময় নারীরা অসুস্থ হতে পারে; কিন্তু মেডিক্যাল সেন্টারে রাত আটটার পর কোনো নারী ডাক্তার পাওয়া যায় না। মাত্র দুজন নারী ডাক্তার দিয়ে একটি মেডিক্যাল সেবা দিতে পারে না।'

ডাইনিং-ক্যানটিনের খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আহসান হাবিব বলেন, 'ডাইনিংয়ে ৩০ টাকা দিয়ে এক বেলার খাবার পাওয়া যায়, যা কোনো রকমে পেট ভরে বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া হয়। প্রশাসন ভর্তুকি দিলে আমরা পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খেতে পারতাম।'

জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা–বিষয়ক সম্পাদক হোসনে মোবারক বলেন, মেডিক্যাল সেন্টারে নতুন ওষুধ সংযোজন ও খণ্ডকালীন চিকিৎসক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। কিন্তু ডাইনিং-ক্যানটিনের ভর্তুকির বিষয়ে প্রশাসন না করে দিয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তুকি আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানালেও প্রশাসন নিরুৎসাহিত করেছে।

শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকসংকট

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটসহ কয়েকটি বিভাগে শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করলে অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বাইরে অপেক্ষা করেন। প্রশাসন শুধু আশ্বাস দিয়েই যায়, কিন্তু সমাধানে তেমন উদ্যোগ নেয় না।

রেজিস্ট্রার বিল্ডিং ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় আগের মতোই চলছে। পরীক্ষার ফি জমা দেওয়া, সনদ উত্তোলনসহ বিভিন্ন কাজে শিক্ষার্থীদের পাঁচ থেকে সাতটি দপ্তরে ঘুরতে হয়, ফলে হয়রানির শিকার হন তাঁরা। অটোমেশনের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও কোনো অগ্রগতি নেই।

বিভিন্ন বিভাগে শতাধিক শিক্ষকের সংকট রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে কোনো বিভাগেই নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই বছর হতে চললেও কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেয়নি। সম্প্রতি বিভিন্ন বিভাগে ৩১ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় সংস্কার আনতে গিয়ে বিলম্ব হয়েছে। এখন নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত হয়েছে, ধীরে ধীরে শিক্ষকসংকট দূর হবে। ক্লাসরুমের সংকটের বিষয়ে কাজ চলছে। লেকচার থিয়েটার ও কলা অনুষদের সম্প্রসারিত ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে সংকট থাকবে না। অটোমেশনের কাজও প্রক্রিয়াধীন।

চাঁদাবাজি ও ছিনতাই কমেছে

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে ইন্টারনেট, কেবল ব্যবসা, হোটেল, বাস কাউন্টারে মাসিক চাঁদা আদায় করতেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। চাঁদা না দিলে আবাসিক হলে আটকে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাস আটকে টাকা আদায়, মাসোয়ারা না পেয়ে লেগুনা আটক, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের আটকে টাকা আদায়ের অভিযোগও ছিল।

গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ধরনের ঘটনা তেমন সামনে আসেনি। বটতলার একটি হোটেলের মালিক হজরত আলী বলেন, 'আগে দোকানগুলোতে অনেকে বাকি খেয়ে টাকা না দিয়ে চলে যেত। টাকা চাইলে মারধর করত। এখন এসব ঘটনা নেই।'

রাজনৈতিক রেষারেষি

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। ছাত্রলীগের বাইরে শুধু বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো রাজনীতি করত। বর্তমানে সে অবস্থা নেই। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে ইসলামী ছাত্রশিবির। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির ২৫টি পদের ২০টিতে জয়লাভ করে। ছাত্রদলও নিজেদের মতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রসংগঠনগুলো সেবামূলক কর্মসূচি নিচ্ছে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ছাত্রদলের সঙ্গে ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও জাকসুর মধ্যে রেষারেষি দেখা যাচ্ছে।

জাকসু ও ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি জাতীয় কিছু বিষয়ে বা দলীয় ঊর্ধ্বতনদের চাপে মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে। সব সংগঠনকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে উষ্মা ও বৈরিতা দূর করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে চান। তবে কোনো কোনো সংগঠন গুপ্ত থেকে অপরাজনীতির চেষ্টা করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করলে পরিণাম সুখকর হবে না।