ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হকার পুনর্বাসন ও নিয়ন্ত্রণে যৌথ উদ্যোগ শুরু করেছে। প্রস্তাবিত 'ঢাকা সিটি হকার ম্যানেজমেন্ট পলিসি ২০২৬'-এর আওতায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ডিজিটাল আইডি কার্ড বিতরণ
প্রথম ধাপে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় ৩০০ হকারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। মঙ্গলবার নগর ভবনে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ ২০২ হকারের মধ্যে ডিজিটাল আইডি কার্ড বিতরণ করে। এই কার্ডে কিউআর কোড সংযুক্ত রয়েছে, যা সরকারি নিবন্ধন দলিল হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে হকাররা নির্ধারিত এলাকায় বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন এবং মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
পুনর্বাসন এলাকা
ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানান, মিরপুর-১০ থেকে হকারদের মিরপুর-১৩-এর বিআরটিএ অফিসের বিপরীত এলাকায় এবং মিরপুর-১ থেকে গাবতলী কিচেন মার্কেট এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, মোট ৮২৯ হকারকে ধাপে ধাপে পুনর্বাসনের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি হকারদের পরবর্তী ধাপে আইডি কার্ড ইস্যু ও নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করা হবে।
নিয়ম লঙ্ঘনে উচ্ছেদ
কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, নির্ধারিত এলাকার বাইরে ফুটপাত দখল করলে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। প্রশাসক বলেন, 'নির্ধারিত সময়ের পর যদি কেউ অনুমোদিত এলাকার বাইরে ফুটপাত দখল করে থাকে, তাহলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।'
মনিটরিং কমিটি
ডিএনসিসি আরও জানায়, ছয়টি শহরের মাঠ পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহারের প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে, কারণ এই মাঠগুলো শিশুদের খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত হয়। ভবিষ্যতে উপযুক্ত স্থানে হকার মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ডিএনসিসি কর্মকর্তা ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি বাস্তবায়ন তদারকি করবে।
দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগ
প্রথম ধাপে ডিএসসিসি ১০০ হকারকে ডিজিটাল আইডি কার্ড দিয়েছে এবং রমনা ভবন লিংক রোড এলাকায় তাদের পুনর্বাসনের জন্য নির্ধারিত স্থান বরাদ্দ করেছে। ডিএসসিসি কর্মকর্তারা জানান, নতুন ভেন্ডিং জোনগুলো নির্ধারিত সময়সূচির অধীনে পরিচালিত হবে, যেখানে দিন ও রাতের বাজার বসবে। সম্ভাব্য স্থানের মধ্যে রয়েছে গুলিস্তান, মতিঝিল, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকা, নিউ মার্কেট দক্ষিণ গেটের আশপাশ ও শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি প্রাঙ্গণ।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
ডিএসসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দ্রুত হকারদের বৈধতা যাচাই করতে পারবে। কর্তৃপক্ষ পথচারীদের চলাচলের জন্য সর্বদা কমপক্ষে ৫-৬ ফুট ফুটপাত খালি রাখা বাধ্যতামূলক করেছে।
নীতি প্রণয়ন
ডিএসসিসি প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুস সালাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য একটি সুশৃঙ্খল শহর পরিবেশ ও নিম্নআয়ের হকারদের জীবিকা উন্নয়ন। কর্মকর্তারা আরও জানান, 'ঢাকা সিটি হকার ম্যানেজমেন্ট পলিসি ২০২৬'-এর খসড়া স্থানীয় সরকার বিভাগে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। এই নীতিতে নির্ধারিত ভেন্ডিং জোন, সময়ভিত্তিক বাজার পরিচালনা ও কঠোর প্রয়োগ ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছে, ফুটপাতে কোনো স্থায়ী স্থাপনা অনুমোদিত হবে না এবং অননুমোদিত হকাররা যেকোনো সময় উচ্ছেদের মুখোমুখি হতে পারেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ভেন্ডিং এলাকায় অবৈধ চাঁদাবাজি রোধে মনিটরিং জোরদার করবে। নগর কর্তৃপক্ষ এই উদ্যোগকে ঢাকাকে একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহরে রূপান্তরের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের অর্থনৈতিক চাহিদার সঙ্গে নগর শৃঙ্খলার ভারসাম্য বজায় রাখবে। সফল বাস্তবায়নের জন্য হকার, সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে তারা মন্তব্য করেন।



