সমুদ্রে বিলীন হাফেজ সায়েমের স্বপ্ন, উদ্ধার লাশ ২২ ঘণ্টা পর
সমুদ্রে বিলীন হাফেজ সায়েমের স্বপ্ন, লাশ উদ্ধার ২২ ঘণ্টা পর

কক্সবাজারের ইনানী সৈকতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হওয়া কুরআনে হাফেজ মোহাম্মদ নূর প্রকাশ সায়েম চৌধুরীর (২২) লাশ প্রায় ২২ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়েছে। সফল ব্যবসায়ী হয়ে পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন ছিল তার; কিন্তু সমুদ্রের লোনা পানিতে বিলীন হয়ে গেল সেই স্বপ্ন।

কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা

শনিবার (২৭ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় দুই বন্ধু মিলে মোটরসাইকেলযোগে কক্সবাজার পৌঁছান। তারা মেরিন ড্রাইভ হয়ে উখিয়া ইনানী সৈকতের দক্ষিণ পাশে নৌবাহিনীর জেটি সংলগ্ন (পালংকী রেস্তোরাঁর সামনে) সৈকতে গোসলে নামেন। এ সময় উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের ধাক্কায় সায়েম নিখোঁজ হন, তবে অপর বন্ধু আরমান প্রাণে রক্ষা পান। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর রোববার সকাল ১০টার দিকে মেরিন ড্রাইভের রেজু ব্রিজের উত্তর পাশের একটি খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধার অভিযান নিশ্চিত করলেন ইউএনও

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার রোববার দুপুরে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, রোববার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার সোনারপাড়ার রেজু খাল ব্রিজ এলাকার প্যারাবন থেকে সায়েমের লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড এবং বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির কর্মীরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। পরে লাশটি আইনগত প্রক্রিয়ার জন্য রামু থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিহতের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিহতের পরিচয় ও পরিবার

নিহত মো. সায়েম (২২) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের কুয়াইশ ভরাপুকুর রাহাত খান চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা মো. ইকবালের একমাত্র পুত্র। সায়েম চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। প্রাণে রক্ষা পাওয়া বন্ধু আরমান রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের কচুখাইন এলাকার মো. কামালের পুত্র। তিনি চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় ফুডপান্ডায় কাজ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন্ধুর বর্ণনা

নিহত সায়েমের বন্ধু মো. আরমান বলেন, "আমার বন্ধু সায়েম ভ্রমণ পিপাসু ছিল। ২০২২ সালে চট্টগ্রামের সিআরবিতে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। গত শুক্রবার ভোরে আমরা ৫টি মোটরসাইকেলে ১০ বন্ধু বান্দরবান ভ্রমণে যাই। এর মধ্যে ৮ জন ফিরে গেলেও আমি ও সায়েম কক্সবাজার বেড়াতে যাই। দুপুরের দিকে পালংকী রেস্তোরাঁর সামনে সৈকতে গোসল করতে নামি।" এর আগে তারা সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে বেশ কিছু ছবি তোলে। সায়েম গোসলে নামলে হঠাৎ বড় একটি ঢেউয়ের ধাক্কায় সে গভীর সাগরের দিকে ভেসে যায়। নির্জন সৈকতে তখন লাইফগার্ড, পুলিশ বা লোকজনের তেমন উপস্থিতি ছিল না। আরমানের চিৎকার ও কান্নাকাটি শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন।

পরিবারের শোক

নিহতের চাচা মো. আলমগীর চৌধুরী অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, "আমার ভাইপো সায়েম খুবই পরিশ্রমী, কর্মঠ এবং ভ্রমণ পিপাসু ছিল। সে একজন কুরআনে হাফেজ। পড়াশোনার পাশাপাশি চট্টগ্রামের চান্দগাঁও মৌলভী পুকুরপাড় এলাকায় নূর মেডিকো নামে একটি ওষুধের ফার্মেসির ব্যবসা করত। সে বুড়িশ্চর জিয়াউল উলুম কামিল মাদ্রাসা থেকে আগামী মাসের দুই তারিখ থেকে অনুষ্ঠিতব্য আলিম পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। অথচ সে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে আজ লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে; যা কখনও মেনে নিতে পারছি না।"

একমাত্র পুত্রসন্তান সায়েমকে হারিয়ে তার মা শিরিন আক্তার পাগলপ্রায়। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে প্রিয় পুত্রের শোকে বিলাপ করতে করতে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি স্তব্ধ ও বিষণ্ণ হয়ে পুত্রের সফল ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্নের কথা বলে বিলাপ করতে দেখা গেছে। সায়েমের মৃত্যুর খবর গ্রামের বাড়িতে ছড়িয়ে পড়লে কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। লাশ উদ্ধারের পর বাড়িতে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভিড় করেন।