ভারতের গুজরাট রাজ্যের আনন্দ জেলায় এক বাংলাদেশি নারীকে আটক করা হয়েছে। একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক ফোন কলের সূত্র ধরে এই ঘটনা সামনে আসে। গুজরাট পুলিশের বিশেষ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অভিযানের সময় এই অনুপ্রবেশের বিষয়টি ধরা পড়ে। বর্তমানে ওই নারীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ফোন কল থেকে
গুজরাটের আনন্দ জেলার লাম্বভেল গ্রামের বাসিন্দা তরুণ প্যাটেল জানান যে গত ২ জুন তার স্ত্রী কাজল বাংলাদেশে থাকা তার অসুস্থ মায়ের খোঁজ নিতে ফোন করেছিলেন। কাজলের মায়ের সম্প্রতি একটি অস্ত্রোপচার হওয়ায় তিনি কান্নাকাটি করে মায়ের সঙ্গে কথা বলার আকুতি জানান। তখন তরুণ নিজের মোবাইল থেকে একটি আইএসডি কল করেন।
ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই আন্তর্জাতিক কলটি ট্র্যাক করে তরুণের বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশ তরুণের ফোনে বাংলাদেশি নম্বরটি দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে তিনি স্বীকার করেন যে তার স্ত্রী একজন বাংলাদেশি নাগরিক।
পুলিশের বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ
আনন্দ জেলার পুলিশ সুপার জি.জি. জাসানি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে কাজল নামের ওই নারী কোনো বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা বিয়ের আইনি নথিপত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে গুজরাটে বসবাস করছিলেন। নথিপত্র না থাকায় পুলিশ কাজলকে আটক করে বর্তমানে আনন্দের একটি নারী সুরক্ষা কেন্দ্রে পাঠিয়েছে।
এই ঘটনার পর থেকে তরুণের দুই সন্তান মায়ের জন্য প্রতিনিয়ত কান্নাকাটি করছে। কাজলকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে তাদের পুরো পরিবারটি ভেঙে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তরুণ। কাজলের শাশুড়ি ইন্দুবেনও তার পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো উল্লেখ করে তার দ্রুত বাড়ি ফেরার আকুতি জানিয়েছেন।
প্রেম থেকে বিয়ে: কাজলের গল্প
অনুসন্ধানে জানা গেছে যে ২০১২ সালে বাংলাদেশের গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা কাজুলির সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় গুজরাটের তরুণ প্যাটেলের। পরবর্তীতে তাদের প্রেম গভীর হলে তরুণ তাকে পাসপোর্ট তৈরি করে ভারতে আসার পরামর্শ দেন। তবে কাজুলির পরিবার তাকে বাংলাদেশে বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করলে তিনি পাসপোর্ট বানানোর জন্য এক দালালের কাছে টাকা দিয়ে প্রতারিত হন।
অবশেষে পারিবারিক চাপ থেকে বাঁচতে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে প্রথমে কলকাতা এবং পরে গুজরাটে এসে তরুণকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে নিজের নাম পরিবর্তন করে কাজল রাখেন।
মানসিক চাপে কাজল ও আইনি লড়াই
বর্তমানে কাজলকে আনন্দের ‘জাগ্রুতি মহিলা সংগঠন’ নামের একটি হোমে রাখা হয়েছে। এই সংগঠনের সভানেত্রী আশা দালাল জানিয়েছেন যে কাজল তার দুই ছেলের জন্য সারাক্ষণ কান্নাকাটি করেন এবং বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে আর কখনোই ভারতে ফিরতে পারবেন না— এই ভয়ে চরম মানসিক চাপে আছেন।
অন্যদিকে তরুণ প্যাটেল তার স্ত্রীকে ফেরত পাঠাতে বাধা দিতে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মিতেশ প্যাটেলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছেও আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন। তরুণের আইনজীবী জয়নব সাইয়েদ জানিয়েছেন যে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের ভিত্তিতে তারা আদালতে কাজলের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য লড়াই করবেন।
অপারেশন ডেল্টা হান্ট ও অনুপ্রবেশকারী আটক
গুজরাট পুলিশ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে ‘অপারেশন ডেল্টা হান্ট’ নামের একটি বিশেষ চিরুনি অভিযান শুরু করেছে। ২০২৬ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে এই অভিযানের মাধ্যমে রাজ্যটি থেকে ৩৬২ জন কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০৩ জন পুরুষ, ১৮৮ জন নারী এবং ৭১ জন শিশু রয়েছে।
এ ছাড়াও পুলিশ উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্যে আরও ৭৮২ জনেরও বেশি সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং অবৈধ নথিপত্র সরবরাহকারী স্থানীয় দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত শুরু করেছে। সূত্র: বিবিসি



