৫৪ বছর পর নিখোঁজ থাকার পর নিজ বাড়ি ফিরলেন বৃদ্ধ সৈয়দ আহম্মদ
৫৪ বছর পর নিখোঁজ থাকার পর বাড়ি ফিরলেন সৈয়দ আহম্মদ

বাড়ির আঙিনায় বসে স্বজনদের নিজের ফিরে আসার গল্প বলছেন সৈয়দ আহম্মদ (লাঠি হাতে)। বাড়ির আঙিনায় বৃদ্ধ এক মানুষকে দেখে ভিড় জমে যায়। বৃদ্ধ মানুষটি নিজের পরিচয় দিয়ে বলছিলেন, তিনি এ বাড়িরই সন্তান। স্ত্রী-সন্তান সবাইকে ফেলে গেছেন এখানে। হিন্দি আর ভাঙা বাংলা মিশিয়ে বলা তাঁর কথাগুলো সবার কাছে খুব বিস্ময়কর ঠেকছিল। স্ত্রী, মা–বাবাসহ যাঁদের নাম বলেছেন, তাঁদের কেউই আর বেঁচে নেই। সব বিবরণ দেখে একজন তাঁকে চিনতে পারেন। চিনতে পারলেও বিশ্বাস হচ্ছিল না তাঁরও। এমন গল্প যে রূপকথাকেও হার মানায়। বাড়ির লোকজন জানতে পারে, ৫৪ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া সৈয়দ আহম্মদ নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছেন।

নিখোঁজের ৫৪ বছর পর বাড়ি ফেরা

সৈয়দ আহম্মদের বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীদিয়া গ্রামে। ৫ মে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়ির লোকজন তাঁকে মৃত বলেই জানত। স্ত্রী, মা–বাবা তাঁর অপেক্ষায় থেকেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। জাহাজের চাকরির জন্য যখন বাড়ি ছাড়েন, তখন তরুণ ছিলেন তিনি। বাড়িতে স্ত্রী আর চার মাস বয়সী ছেলেকে ফেলে গিয়েছিলেন। এখন ৮৩ বছর চলছে তাঁর। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ছেলে নূর হোসেনও ৫৫ বছরে পা দিয়েছে। বাবা দেখতে কেমন, তা তাঁর স্মৃতিতে থাকার কথা নয়। সে হিসেবে তিনি প্রথমবারের মতো বাবাকে দেখলেন।

নূর হোসেন বলেন, ‘জন্মের পর কখনো বাবাকে দেখিনি। এখন তিনি ফিরে এসেছেন, এটা বিশ্বাসই হচ্ছে না।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাহাজডুবি ও উদ্ধারের ঘটনা

চট্টগ্রামের একটি কার্গো জাহাজে শ্রমিকের কাজ করতেন সৈয়দ আহম্মদ। ৫৪ বছর আগের এক ঝড়ে জাহাজটি কক্সবাজারের উপকূলের কাছাকাছি কোথাও ডুবে যায়। এর পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি। স্বজনেরাও ধরে নিয়েছিলেন তিনি আর বেঁচে নেই। তবে সেই ধারণা ভেঙে তিনি ফিরেছেন। সৈয়দ আহম্মদকে দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন ছুটে আসেন। অনেকেই তাঁর কাছে হারিয়ে যাওয়া ও ফিরে আসার গল্প শুনতে চাইছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সৈয়দ আহম্মদের এক সৎভাই আবুল খায়ের তাঁকে চিনতে পেরেছেন। বর্তমানে তিনি সেই ভাইয়ের বাসায় রয়েছেন। সেখান থেকেই মুঠোফোনে তিনি গতকাল শনিবার বিকেলে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, যখন ঝড় শুরু হয়, তখন তাঁদের কার্গো জাহাজটি কক্সবাজারের কুতুবদিয়া এলাকায় ছিল। এরপর জাহাজটি ডুবে যায়। জাহাজে অন্যদের কী পরিণতি হয়েছিল, সেসব তাঁর মনে নেই। শুধু মনে আছে, তিনি দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে ছিলেন। এরপর ভারতীয় নৌবাহিনী তাঁকে উদ্ধার করে। ভারতেই তাঁর চিকিৎসা হয়। এরপর সেখান থেকে ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রার তাজমহল এলাকায় চলে যান। দেশে ফেরা পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।

স্বপ্নে ছেলেকে দেখে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত

সৈয়দ আহম্মদের দাবি, তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পেয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি স্বপ্নে ছেলেকে দেখতে পান। এরপর তিনি দেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়েই তিনি দেশে আসার চেষ্টা করছিলেন। তবে তাঁর এসব কাগজপত্র চুরি হয়েছে। পরে যশোর সীমান্তে এসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে নিজের পরিস্থিতির কথা জানালে তারা বাংলাদেশে আসতে সহায়তা করে। এরপর ঢাকা হয়ে নোয়াখালী ও পরে সেখান থেকে হাতিয়ায় পৌঁছে মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে নিজের বাড়ি খুঁজে বের করেন।

সৈয়দ আহম্মদের সৎভাই আবুল খায়ের বলেন, ‘ভাই নিখোঁজ হওয়ার সময় আমার বয়স ছিল ১০ থেকে ১১ বছর। তখন তাঁর ছেলে নূর হোসেনের বয়স মাত্র কয়েক মাস। দীর্ঘ সময় ফিরে না আসায় আমরা ধরে নিয়েছিলাম, তিনি আর বেঁচে নেই। এত বছর পর ভাইকে ফিরে পাব, কখনো ভাবিনি। তাঁর মুখও প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম। এখন তাঁর কথা শুনে পুরোনো অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে।’

ছেলের অভিযোগ ও পুলিশি ব্যবস্থা

এদিকে জীবনে প্রথমবার বাবাকে কাছে পেয়ে খুশি ছেলে নূর হোসেন। তবে বাবাকে নিজের বাড়িতে রাখতে না পারার অভিযোগও করেছেন তিনি। নূর হোসেনের দাবি, তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা সৈয়দ আহম্মদকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে আসতে দিচ্ছেন না। এ ঘটনায় তিনি হাতিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন বলেন, ৫৪ বছর পর ফিরে আসা সৈয়দ আহম্মদকে নিয়ে তাঁর ছেলে একটি জিডি করেছেন। বিষয়টি পারিবারিক। পরিবার চাইলে পুলিশ আইনগত সহায়তা দেবে।