বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবনে উড়োজাহাজ আছড়ে পড়ার রহস্য ঘনীভূত, নিকট সংঘর্ষ এড়াতে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জরুরি আরোহণ
বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবনে উড়োজাহাজ আছড়ে পড়ার রহস্য ঘনীভূত

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের সবচেয়ে উঁচু ভবনে গত সপ্তাহে একটি ছোট উড়োজাহাজ আছড়ে পড়ার ঘটনায় রহস্য দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। একটি ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বেইজিংয়ের সবচেয়ে উঁচু ভবন ‘সিআইটিআইসি টাওয়ারে’ আছড়ে পড়ার আগে ছোট ওই উড়োজাহাজটি হাইনান এয়ারলাইনসের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের এতটাই কাছে চলে গিয়েছিল যে মাঝআকাশে দুই উড়োজাহাজের প্রায় সংঘর্ষ হতে যাচ্ছিল। ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার কারণে অন্তত দুটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজকে বেইজিংয়ে তাদের অবতরণ বাতিল করে ফিরে যেতে হয়েছিল।

ঘটনার বিবরণ ও তাৎক্ষণিক প্রভাব

গত শুক্রবার একটি ছোট উড়োজাহাজ (লাইট এয়ারক্রাফট) বেইজিংয়ের আকাশচুম্বী ভবনে আছড়ে পড়ে। কিন্তু কী কারণে, কীভাবে এ ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—কীভাবে একটি এক-ইঞ্জিনবিশিষ্ট উড়োজাহাজ বিশ্বের সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমাগুলোর একটিতে ঢুকে যেতে সক্ষম হলো।

দুই আসনের সানওয়ার্ড এসএ ৬০এল অরোরা স্পোর্ট উড়োজাহাজটি ২৬ জুন স্থানীয় সময় বিকেল প্রায় ৫টা ৫৫ মিনিটে ১০৯ তলা সিআইটিআইসি টাওয়ারে আঘাত হানে। এতে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে ভবনটির ওপর থেকে বিশাল আকারের ধ্বংসাবশেষ ও উড়োজাহাজের বিভিন্ন জ্বলন্ত অংশ নিচের সড়কে পড়ে। উড়োজাহাজটিতে পাইলট একাই ছিলেন। তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ ঘটনায় আরও ১৩ জন আহত হয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য ও প্রায়-সংঘর্ষ

এ ঘটনায় ব্লুমবার্গ প্রথম ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান ফ্লাইটরাডার২৪–এর তথ্য প্রকাশ করে। সেই তথ্য অনুযায়ী, অনিয়ন্ত্রিতভাবে উড়ে চলা ছোট উড়োজাহাজটি সরাসরি হাইনান এয়ারলাইনসের একটি এয়ারবাস এ৩৩০-এর গতিপথে প্রবেশ করেছিল। যাত্রীবাহী এয়ারবাসটি উরুমকি থেকে চীনের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিল। এই বিমানবন্দরে গড়ে প্রায় প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একটি করে উড়োজাহাজ ওঠানামা করে।

গতিপথে অন্য একটি উড়োজাহাজকে দেখতে পেয়ে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটির পাইলট দ্রুত বিমানবন্দরে অবতরণের প্রক্রিয়া বাতিল করেন এবং নির্ধারিত ফ্লাইটপথ থেকে সরে গিয়ে ছয় মিনিটের মধ্যে প্রায় ৯৯০ মিটার উচ্চতা থেকে দ্রুত ২ হাজার ৭৯০ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় উঠে যান। এ সময় এক পর্যায়ে দুটি উড়োজাহাজের মধ্যে দূরত্ব মাত্র ৪৫৭ মিটারে নেমে এসেছিল, যা নিরাপদ মানদণ্ডের চেয়ে কম।

হাইনান এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজের পাইলটকে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) অবতরণ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল, নাকি উড়োজাহাজটির সংঘর্ষ-এড়ানোর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সতর্কবার্তা দিয়েছিল—তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। এর পরপর বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ উড়োজাহাজগুলোকে বিমানবন্দরের দক্ষিণ দিকের পরিবর্তে উত্তর দিক থেকে অবতরণের নির্দেশ দেয়। ফলে অন্তত দুটি উড়োজাহাজকে অবতরণ বাতিল করতে বাধ্য হতে হয় এবং বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

উড়োজাহাজের উৎস ও আকাশসীমা লঙ্ঘন

বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবনে আছড়ে পড়া উড়োজাহাজটি ছিল দেশীয়ভাবে নির্মিত এবং স্থানীয় একটি সাধারণ বিমান চলাচল কোম্পানির মালিকানাধীন। এটি বেইজিংয়ের শিফোসি বিমানবন্দর থেকে উড়াল দিয়েছিল। চীনে উড়োজাহাজ উড্ডয়নের বিধিমালা অনুযায়ী, সাধারণ সব ধরনের উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য আগাম অনুমতি নিতে হয় এবং অপারেটরদের উড্ডয়নের আগের দিন বেলা তিনটার মধ্যে বিস্তারিত ফ্লাইট পরিকল্পনা জমা দিতে হয়। এ ছাড়া শহুরে এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সাধারণত নিষিদ্ধ। তার ওপর গত মাসে বেইজিংয়ে বিনোদনমূলক উদ্দেশ্যে অনানুষ্ঠানিক উড়োজাহাজ চালনা এবং ভোক্তা-স্তরের ড্রোন ব্যবহার কার্যত নিষিদ্ধ করতে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

সিআইটিআইসি টাওয়ারটিতে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সিআইটিআইসি গ্রুপ এবং প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবার কার্যালয়। এটি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। কাছেই যুক্তরাজ্যের দূতাবাসসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস রয়েছে, পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা আইএফসির চীনা কার্যালয়টিও অবস্থিত।

বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা ঘাটতি

অস্ট্রেলিয়ার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন প্রজেক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিথ টনকিন রয়টার্সকে বলেন, ‘ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত—এ ঘটনা বিমান চলাচল ও প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের প্রতিরোধ সক্ষমতায় ঘাটতি থাকার বিষয়টি সামনে নিয়ে এনেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত না জেনেও এ কথা বলা যায়।’

এ ঘটনা নিয়ে গতকাল বুধবার প্রকাশিত বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রিকা বেইজিং ডেইলিতে প্রকাশিত মাত্র ৬০ শব্দের এক প্রতিবেদনে গত শুক্রবারের ঘটনার মৌলিক তথ্যটুকু শুধু তুলে ধরা হয়েছে। এটাই এখন পর্যন্ত ঘটনাটি সম্পর্কে চীনের প্রকাশিত একমাত্র সরকারি বিবৃতি।

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা সক্রিয়ভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। শুক্রবারের ঘটনার পর সিআইটিআইসি টাওয়ারের ছবি এবং ভবনটিকে ঘিরে তৈরি নানা মিমও চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলের ছবি বা ভিডিও ধারণ করা প্রত্যক্ষদর্শীদের তাদের নিজ নিজ ফোন থেকে সেই ভিডিও মুছে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছে।

সিনহুয়া এবং চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনসহ জাতীয় গণমাধ্যমগুলো গত মঙ্গলবার পর্যন্ত এই ঘটনার বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। চাওইয়াং জেলা সরকার শনিবার উইচ্যাটে একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে, যেখানে ঘটনাটিকে ‘একটি এক-ইঞ্জিন, দুই আসনের লাইট স্পোর্ট উড়োজাহাজের’ একটি ‘সুউচ্চ ভবনের সঙ্গে সংঘর্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বিবৃতিতে ভবন বা পাইলট—কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন এ ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলাকালে সাময়িকভাবে হালকা উড়োজাহাজের উড়াল বন্ধ রেখেছে। এই নিষেধাজ্ঞা দেশটির নবীন একটি আর্থিক খাতের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলেছে। চীন তাদের ‘লো-অল্টিটিউড ইকোনমি’ খাতের দ্রুত বিস্তারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ‘লো-অল্টিটিউড ইকোনমি’ খাত বলতে নিম্ন উচ্চতায় পরিচালিত উড্ডয়ন সেবাগুলোকে বোঝায়। এর মধ্যে ছোট ছোট উড়োজাহাজ এবং ড্রোন চলাচলও অন্তর্ভুক্ত। এটিকে একটি কৌশলগত জাতীয় প্রবৃদ্ধি খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিভিল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি সাড়ে ৩ ট্রিলিয়ন (সাড়ে ৩ লাখ কোটি) ইউয়ানের বাজারে পরিণত হতে পারে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি চায়নার নন–রেসিডেন্ট স্কলার চং জা ইয়ান বিবিসিকে বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে ১৯৮৭ সালের মে মাসের একটি ঘটনার মিল আছে। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জার্মান পাইলট ম্যাথিয়াস রুস্ত তাঁর হালকা উড়োজাহাজ নিয়ে মস্কোর রেড স্কয়ারে অবতরণ করেছিলেন। ঘটনাটি সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছিল। ঘটনার পর আকাশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে পদচ্যুত করা হয়েছিল। চং জা ইয়ান বলেন, বেইজিংয়ের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও কিছু কর্মকর্তাকে তাঁদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। চংয়ের মতে, একটি ছোট উড়োজাহাজ যদি সিআইটিআইসি টাওয়ারে আঘাত হানতে পারে, তবে তাত্ত্বিকভাবে কোনো ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রও তা করতে সক্ষম হতে পারে। এটি বেইজিংয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর জন্য কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।