ব্রিটেনের সাবেক উপনিবেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সাবেক উপনিবেশের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি ব্রিটিশ মন্ত্রীর

যুক্তরাজ্যের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রেভারম্যান দাবি করেছেন, ব্রিটেনের সাবেক উপনিবেশগুলোর উচিত লন্ডনকে উলটো ক্ষতিপূরণ দেওয়া। শুক্রবার (৩ জুলাই) সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, উপনিবেশগুলো গড়ে তুলতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যে ‘বিনিয়োগ, শ্রম ও অবদান’ রেখেছে, তার বিনিময়ে এই অর্থ দেওয়া উচিত।

ব্রেভারম্যানের বিতর্কিত মন্তব্য

চলতি বছরের শুরুর দিকে কনজারভেটিভ পার্টি ছেড়ে কট্টর ডানপন্থী দল ‘রিফর্ম ইউকে’-তে যোগ দেওয়া এই রাজনীতিক ক্ষতিপূরণ বিতর্কে যুক্ত হয়ে বলেন, ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিশ্বের জন্য অনেক ভালো কিছু করেছে।’ ব্রেভারম্যান আরও বলেন, ‘অবশ্যই দাসপ্রথা একটি ঘৃণ্য বিষয় ছিল। কিন্তু ১৮ শতকের কর্মকাণ্ডের জন্য ২১ শতকের ব্রিটিশ জনগণকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, এমন প্রত্যাশার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’

ঐতিহাসিক তথ্যের বিপরীতে দাবি

তবে তার এই দাবিটি সত্য নয়। ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর দাসমালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে ১৮৩৫ সালে ২ কোটি পাউন্ড ঋণ নেওয়া হয়েছিল, যুক্তরাজ্যের করদাতারা যা অনেক দিন ধরে পরিশোধ করেছেন। ওই অংক ছিল তখনকার যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশ। বর্তমান মূল্যে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলারেরও বেশি। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্য সরকার স্বীকার করে যে, ২০১৫ সালে তারা ওই ঋণের পুরো অর্থ পরিশোধ করতে সক্ষম হয়। এর অর্থ হলো, দাসদের নয়, বরং দাসমালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য নেওয়া ঋণের বোঝা ব্রিটিশ করদাতাদের বংশপরম্পরায় টানতে হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উপনিবেশের ‘বিনিয়োগ’ দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই

ব্রেভারম্যান আরও একধাপ এগিয়ে লিখেছেন, ‘সরকার যদি সত্যিই বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবে, তবে সাবেক উপনিবেশগুলোর উচিত ব্রিটেনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। কারণ, এই দেশ বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ, শ্রম ও অবদান রেখেছে, যার ওপর ভিত্তি করেই আজ অনেক শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত গড়ে উঠেছে।’ তবে উপনিবেশের মানুষের কল্যাণে ব্রিটেন সেখানে ‘বিনিয়োগ’ করেছিল—এমন দাবির কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। ঔপনিবেশিক অর্থনীতি মূলত লন্ডনের স্বার্থে সম্পদ, শ্রম ও অর্থ শোষণের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল; উপনিবেশিত সমাজগুলোর স্বকীয় উন্নয়নের জন্য নয়।

ভারত থেকে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার লুট

অর্থনীতিবিদ উৎস পট্টনায়েকের প্রায় দুই শতকের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঔপনিবেশিক শাসনামলে শুধু ভারত থেকেই প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন (৪৫ লাখ কোটি) ডলার লুট করেছিল ব্রিটেন। গবেষণাটি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যখন তার চূড়ায় ছিল, তখন পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় এক-চতুর্থাংশই তাদের দখলে ছিল।

প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা

লেবার পার্টির এমপি বেল রিবেরো-অ্যাডির একটি পোস্টের জবাবে ব্রেভারম্যান এসব কথা বলেন। রিবেরো-অ্যাডি ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল জ্যামাইকার উচিত একটি আনুষ্ঠানিক পিটিশনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের দাবিটি সরাসরি রাজা চার্লসের কাছে তুলে ধরা। ওই পোস্টে রিবেরো-অ্যাডি বলেছিলেন, ‘ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি স্রেফ এড়িয়ে যাওয়ার প্রিয় কৌশলটি বজায় রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।’

ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুয়েলা ব্রেভারম্যানের মা-বাবা সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকেই ব্রিটেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তার এমন মন্তব্যের পর অনলাইনে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। এক্সে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘অবশ্যই দাসপ্রথা ঘৃণ্য ছিল, কিন্তু—এভাবে কোনো বাক্য শুরু করাটাই এক উদ্ভট ব্যাপার।’ অন্য একজন লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কোনো বিনিয়োগ করেনি; তারা উপনিবেশের সম্পদ ও অর্থ লুট করেছিল কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থে, উপনিবেশগুলোর কল্যাণে নয়।’