জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা সোমবার রাত ১২টার দিকে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন। পোস্টটিতে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আদিলের স্মৃতিচারণ করেছেন, যা যুগান্তরের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।
আদিলের শেষ দিনের গল্প
আদিল ক্লাস টেনে পড়ত। ২০২৫ সালে দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল তার। যেদিন সে শহীদ হয়, তার ঠিক আগের দিনের কথা। চারদিকে তখন আন্দোলনের উত্তাপ। আদিল হঠাৎ মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা মা, এই যে এত মানুষ মারা যাচ্ছে। কে মারা গেল, সেটা মানুষ চেনে কী করে?’ মা সহজ করে উত্তর দেন, ‘ওদের সঙ্গে যে আইডি কার্ড থাকে, সেটা দেখেই খুঁজে বের করে।’
পরদিন শুক্রবার সকালবেলা আদিল তার মায়ের কাছে এসে বলল, ‘আম্মু, আমার আইডি কার্ডটা দাও তো।’ আইডি কার্ড কী কাজে লাগবে? আদিল একটা কারণ দেখাল। কিন্তু মায়ের মনে অজানা এক ভয় কাজ করছিল। তিনি আইডি কার্ডটা লুকিয়ে ফেললেন এবং ছেলেকে কড়া করে বলে দিলেন, আজ যেন সে কোনোভাবেই বাইরে না যায়।
গ্রিল খাওয়ার প্রতিশ্রুতি
মায়ের মন শান্ত করতে আদিল বলল, ‘আচ্ছা, আমি বাইরে যাচ্ছি না। একটু ছাদে যাব।’ যাওয়ার আগে মাকে সে বলল, ‘আম্মু, আজ সন্ধ্যায় আমরা গ্রিল খাব।’ মা বললেন, ‘গ্রিল খেতে তো অনেক টাকা লাগবে, এখন তো টাকা-পয়সা কম।’ আদিল নিজে টুকটাক টাকা জমাত। জমানো টাকা থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট সে মায়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘এই টাকাটা রাখো। বিকেলে আমরা গ্রিল খাব।’ সেই ৫০০ টাকার নোটটা মা আজও সযত্নে রেখে দিয়েছেন। শুধু যে ছেলের সঙ্গে বিকালে গ্রিল খাওয়ার কথা ছিল, সে আর ফেরে নি।
শহীদ হওয়ার মুহূর্ত
ছাদে যাওয়ার নাম করে আদিল আসলে নেমে গিয়েছিল রাস্তায় আন্দোলনে। সেখানেই গুলি লাগে তার গায়ে। সঙ্গে আইডি কার্ড ছিল না বলে গুলিবিদ্ধ ছেলেটাকে চিনে বের করতেই অনেকটা দেরি হয়ে যায়। রাস্তায় যারা আন্দোলনকারীদের পানি আর খাবার দিচ্ছিলেন, তাদের কয়েকজন ধরাধরি করে আদিলকে বাসায় নিয়ে আসেন। বাবা-মা তখনো বুঝতে পারেননি অবস্থা কতটা গুরুতর। ভেবেছিলেন গুলি লেগেছে, হাসপাতালে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বুঝলেন, আদিল আর নেই।
আদিলের মায়ের বুকে আজও একটা অনন্ত আক্ষেপ বাজে, ‘আমি যদি আইডি কার্ডটা লুকিয়ে না রাখতাম, আদিল ওটা নিয়েই বের হতো। হয়তো কেউ ওকে আগে চিনতে পারত! হয়তো আর একটু আগে হাসপাতালে নিলে আমার ছেলেটাকে বাঁচানো যেত!’
জাতীয় পতাকা ও পরিবারের শোক
আদিলের এক হাতের কব্জিতে বাঁধা ছিল ছোট্ট একটা জাতীয় পতাকা। পিঠে বাঁধা ছিল আরেকটা। পতাকা দুটো দেখে মায়ের আর বুঝতে বাকি রইল না যে আদিল বেশ কয়েক দিন ধরেই নিজেকে তৈরি করছিল। ওরা তিন ভাই। এক ভাই দুবাইয়ে এমবিএ পড়ছেন, দেশে এসেছিলেন বাবার চিকিৎসার জন্য। তাসনিম জারাকে বলছিলেন যে আজ কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তারা কয় ভাই, তিনি উত্তর খুঁজে পান না। ‘আমরা কি এখন দুই ভাই, নাকি তিন ভাই?’
আদিলের বাবার তিন দাবি
আদিলের বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নতুন বাংলাদেশের কাছে তার চাওয়া কী। তিনি তিনটি চাওয়ার কথা জানালেন, কিন্তু নিজের জন্য কিছুই চাইলেন না। প্রথমত, শহিদরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়। তারা প্রাণ দিয়েছে এই দেশের জন্য। তারা গোটা দেশের। শহিদদের নিয়ে কোনো রাজনীতি করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। দেশের যে কোনো সাধারণ মানুষ যেন সহজে ন্যায়বিচার পায়। তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, যেন দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। কারণ নির্বাচনব্যবস্থা ঠিক না থাকার কারণেই আজ দেশের এই অবস্থা।
আদিলরা যে আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমাদের নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ করে দিলেন, আমরা সেই সুযোগ কতটা নিলাম?’



