গাজীপুরের হত্যাকাণ্ডের শিকার পাঁচজনকে গোপালগঞ্জে পাশাপাশি দাফন
গাজীপুর হত্যাকাণ্ডের পাঁচজনকে গোপালগঞ্জে দাফন

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় রাউতকোনা এলাকায় একটি বহুতল বাড়িতে হত্যাকাণ্ডের শিকার শারমিন আক্তার (৩০), তার তিন মেয়ে ও ভাইকে গোপালগঞ্জে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। রোববার বেলা ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।

মরদেহ পৌঁছানোর পর শোকের মাতম

এর আগে ভোর সাড়ে ৬টার দিকে নিহত পাঁচজনের মরদেহবাহী দুইটি অ্যাম্বুলেন্স গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের উত্তর চরপাড়া গ্রামে পৌঁছায়। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছলে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্না ও আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেউই এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলেন না।

নিহতরা হলেন- শারমিন আক্তার (৩০), তার তিন মেয়ে মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮) ও ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ভাই রসুল মোল্লা (১৮)। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়াকে দায়ী করছেন শারমিনের স্বজনরা। ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরেজমিনে শোকের দৃশ্য

রোববার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশের উত্তর চরপাড়া গ্রামে শোকের মাতম চলছে। বাড়ির পাশে ছোট সড়কে রাখা ছিল মরদেহবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স। পাশের মেহগনি বাগানে পৃথক দুটি মশারি টাঙিয়ে সেখানে নারী ও পুরুষের মরদেহ গোসল করানো হচ্ছিল। এদিকে বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে পাশাপাশি পাঁচটি কবর খোঁড়া হচ্ছিল। কবরস্থানে প্রবেশ পথে বাঁশ কাটতেও দেখা যায় কয়েকজনকে।

প্রতিবেশী জগলু মোল্লা, মরিয়ম বেগম, সাবিনা আক্তারসহ অনেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে উচ্চারণ করতে শোনা যায়- এ কেমন পাষণ্ড, বাবা হয়ে কিভাবে সন্তানদের হত্যা করতে পারে?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাবার অভিযোগ

নিহত শারমিন আক্তার ও রসুল মোল্লার বাবা শাহাদাত মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘটনার দিন রাত প্রায় ৯টার দিকে মেয়ে শারমিন তাকে ফোন করে জানিয়েছিল- আব্বা, আমরা ২৪ মে বাসা ছেড়ে চলে আসব। তিনি বলেন, পরদিন সকালে জব্বার মোল্লা (ফোরকানের ভাই) ফোন করে দ্রুত শারমিনের বাসার খোঁজ নিতে বলেন। জব্বার তাকে জানায়, বাসার পরিস্থিতি ভালো না। এরপর তিনি বড় মেয়েকে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিছুক্ষণ পর মেয়ের কাছ থেকে ফোন পেয়ে জানতে পারেন, তাদের পরিবারের সব শেষ হয়ে গেছে।

শাহাদাত মোল্লা বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, মেয়ে শারমিনকে জানালার সঙ্গে বেঁধে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জামাতা ফোরকান মোল্লাকেই দায়ী করেন তিনি। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ফোরকানের সঙ্গে পারিবারিক কলহ চলছিল এবং সে প্রায়ই শারমিনের ওপর নির্যাতন চালাত। আমার মেয়ে-ছেলে নাতনিদের জীবন শেষ করে দিয়েছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।

মা-বোনের আহাজারি

শারমিনের মা ফিরোজা বেগম ও বোন ফাতেমা বেগমের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠছে। বাড়িতে উপস্থিত লোকজনও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। স্বজনরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও অনেকেই কান্না চেপে রাখতে পারেননি।

ময়নাতদন্ত ও মামলা

এর আগে শনিবার রাতে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় মরদেহগুলো গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় শনিবার রাতে কাপাসিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। নিহত শারমিন আক্তারের বাবা শাহাদাত হোসেন মোল্লা বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে তাদের পরিচয় জানানো হয়নি।

পারিবারিক পটভূমি

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৭ বছর আগে ফোরকান মিয়ার সঙ্গে শারমিন আক্তারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর কয়েক বছর ঢাকায় বসবাস করলেও ছয় মাস আগে তারা গাজীপুরের কাপাসিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। ফোরকান প্রাইভেটকার চালিয়ে সংসার চালাতেন।