২০০০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় অপরাধজগতের আলোচিত সন্ত্রাসী হুমায়ুন কবীর ওরফে মুরগি মিলনকে। এরপর দীর্ঘ সময় পাল্টাপাল্টি খুন আর গোলাগুলিতে সরগরম ছিল রাজধানীর অপরাধজগৎ।
একই ধরনের ঘটনা
ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটল গত ২৮ এপ্রিল। শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এল ঢাকার অপরাধজগৎ এবং পেশাদার সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য। গত ২১ মাসে রাজধানীতে এমন ২৩টি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর কোনোটিতে সরাসরি আবার কোনোটির নেপথ্যে ছিল পেশাদার সন্ত্রাসীরা।
খুনের ঘটনা
২৩টি আলোচিত ঘটনার মধ্যে ৭টি রয়েছে খুনের ঘটনা। এর মধ্যে ছয়টিতেই পেশাদার সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রতিপক্ষ দলের কেউ নিহত হন। বাকি একটিতে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। খুনের ঘটনাগুলোর বাইরে বাকিগুলো ছিল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি, বোমা বিস্ফোরণ, কুপিয়ে জখম, মহড়া ও হুমকি।
দ্বন্দ্বের কারণ
তাদের দ্বন্দ্বের জায়গা হলো—পোশাক কারখানার ঝুট, বাসাবাড়ির ময়লা, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, যানবাহনের চাঁদা, কোরবানি পশুর হাট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি কাজ ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন নির্মাণকাজ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়।
ঘটনার এলাকা
অপরাধজগৎকেন্দ্রিক এই ২৩ ঘটনা ঘটেছে ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, গুলশান, বাড্ডা, মগবাজার, হাতিরঝিল ও মতিঝিল অঞ্চলে। ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ হিসেবে পরিচিত ঢাকার অপরাধজগতের মানচিত্রে এই এলাকাগুলো এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার কোথাও পুরোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী, কোথাও তাদের সহযোগী, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী স্থানীয় গোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধজগতের ক্ষমতার পালাবদল চলছে।
৫ আগস্টের পর সক্রিয়তা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভঙ্গুর অবস্থার কারণে মূলত পেশাদার সন্ত্রাসীরা নানাভাবে সক্রিয় হতে শুরু করে। মোহাম্মদপুর এলাকার ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, মিরপুরের আব্বাস আলী (পুলিশের ভাষ্যে ‘কিলার আব্বাস’ হিসেবে পরিচিত), তেজগাঁওয়ের শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামসহ অন্তত সাত আলোচিত সন্ত্রাসী জামিনে মুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন জামিনে বের হয়েই বিদেশে চলে যান। কয়েকজন আগে বিদেশে ছিলেন, সেখানে বসে দেশে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হঠাৎ সক্রিয় হন সুব্রত বাইনও।
নজরদারির অভাব
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালে ২৩ ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীর’ একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় থাকা ইমন, টিটন ও পিচ্চি হেলালের মতো সন্ত্রাসীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি থাকার কথা। তবে এই সন্ত্রাসীদের কে এখন কোথায় আছেন, মামলাগুলোয় জামিনের বাস্তবতা, আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন কি না—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি করা হয়নি। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে সন্ত্রাসী দলগুলো।
পুলিশের পরিকল্পনা
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগই এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছে। দেশের বাইরে থেকেই তারা ঢাকার অপরাধজগতের ‘কাঠি নাড়ছে’। কেউ কেউ দেশে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘এলাকাভিত্তিক এসব সন্ত্রাসী ও তাদের সহযোগীদের তালিকা করা হচ্ছে। খুব শিগগির তাদের বিরুদ্ধে কম্বিং অপারেশন হবে।’
অপরাধকেন্দ্রিক অর্থনীতি
প্রথম আলোর বিশ্লেষণে উঠে আসা সাম্প্রতিক ২৩টি ঘটনার নেপথ্যে কোনো না কোনোভাবে রয়েছে অপরাধকেন্দ্রিক অর্থনীতি। পূর্বশত্রুতার জেরে যে খুনগুলো হয়েছে, সেখানেও বিরোধের নেপথ্যে ছিল অবৈধ অর্থ উপার্জনের নানা উপায়ের নিয়ন্ত্রণ। এই অপরাধীদের অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের দ্বন্দ্বের জায়গা হলো—পোশাক কারখানার ঝুট, বাসাবাড়ির ময়লা, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, যানবাহনের চাঁদা, কোরবানি পশুর হাট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি কাজ ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন নির্মাণকাজ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়।
চাঁদাবাজির ঘটনা
গত বছরের ১৩ মার্চ কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয় হাতিরঝিল এলাকার ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য মো. রাজনকে। মগবাজারের ওয়্যারলেস রেলগেটের পাশের রেললাইনের জমিতে গড়ে তোলা একটি ক্লাবের ভেতরে তাঁকে কোপানো হয় এবং মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়। পরে মৃত ভেবে তাঁকে ফেলে রাখা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজির জন্য বিদেশি নম্বর থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে প্রতিষ্ঠানে গুলি, মালিকের ওপর হামলা এবং কোথাও কোথাও প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটেছে গত ১৯ এপ্রিল। সেদিন রাজধানীর মিরপুরে এক কোটি টাকা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি করে পেশাদার সন্ত্রাসীরা।
হত্যাকাণ্ডের ধরন
গত ২১ মাসে পেশাদার অপরাধীদের দ্বন্দ্বে খুনের ৭টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এগুলোর ধরন অনেকটা একই। তাদের প্রত্যেককে একই ছকে হত্যা করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ হত্যাকাণ্ডগুলোর পরিকল্পনায় ছিল বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীরা। তারা দেশে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, আগে থেকে অনুসরণ, দ্রুত হামলা, মোটরসাইকেল বা দ্রুতগতির বাহনে পালানোর পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সমন্বয় করছে। আবার হত্যার বদলে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নিজেরও অপরাধী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারের জোড়া খুনের ঘটনার মাধ্যমে মূলত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের খুনোখুনির ঘটনা শুরু হয়। ওই ঘটনায় আসামি ছিলেন ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল। এই মামলার আরেক আসামি ছিলেন রায়েরবাজারে কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ইমন হোসেন। এ বছরের ১২ এপ্রিল তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে।
অপরাধীদের সক্রিয়তা
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এ ধরনের তৎপরতার প্রভাব পড়েছে অন্যান্য অপরাধেও। কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন নামে অপরাধীরা সক্রিয় হচ্ছে পেশাদার সন্ত্রাসীদের ছত্রচ্ছায়ায়। মোহাম্মদপুর, বছিলা ও হাজারীবাগ এলাকা এর বড় উদাহরণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এখানে বড় সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি ছোট ছোট ১০টির বেশি গ্রুপ দেশি অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য মহড়া, প্রতিষ্ঠান দখলে গুলি ও হামলাসহ একের পর এক ঘটনা ঘটাতে থাকে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
অপরাধবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব মিলিয়ে ঢাকার অপরাধজগৎ এখন পুরোনো সন্ত্রাসী রাজনীতি ও নতুন নগর-অর্থনীতির মিশ্র রূপ নিয়েছে। জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, আত্মগোপনে থাকা নির্দেশদাতা, স্থানীয় গ্যাং, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও চাঁদাবাজির বাজার—এই পাঁচ স্তর ভাঙতে না পারলে রাজধানীতে খুন, গুলি ও আতঙ্কের এই চক্র থামানো কঠিন হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসীদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়েছেন। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তাঁরা আবার অপরাধে জড়াচ্ছেন কি না, সেটি নজরদারির দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে মনে হয়, তাঁদের যথাযথভাবে নজরদারির মধ্যে রাখা যায়নি।
রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়
এই বিশ্লেষকের মতে, শীর্ষ পর্যায়ের অপরাধীদের অপরাধ করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। আবার বাংলাদেশের বাস্তবতায় কখনো কখনো রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক কর্মীদেরও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এ ধরনের অপরাধীদের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। এ দুই পক্ষ যখন নিজেদের শক্তির বিনিময় করে, তখন সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যও বেড়ে যায়। তাই অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে শীর্ষ পর্যায়ের অপরাধীসহ সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।



