আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ সোমবার সাক্ষী মাহমুদুল হাসান জবানবন্দি দিয়েছেন, যেখানে তিনি টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) গুম করে রাখা অবস্থায় চরম নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় চেয়ারে বসিয়ে তাঁর কানের লতি ও লজ্জাস্থানে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক শকের কারণে তাঁর লজ্জাস্থান দিয়ে তিন-চার দিন রক্ত ঝরে এবং জ্বালাপোড়া করে।
সাক্ষীর পরিচয় ও পটভূমি
মাহমুদুল হাসান তাঁর জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, তাঁর পরিবার জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক। ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী থাকার সময় তিনি শিবিরের সমর্থক ছিলেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে মৎস্য খাতে কর্মরত আছেন।
গুম ও নির্যাতনের ঘটনা
২০১৬ সালের ২০ জুন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে গুম করেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, তাঁকে বাথরুমের জন্য এক মিনিট সময় দেওয়া হতো। বেশি সময় নিলে বাথরুমে ঢুকে তাঁকে মারধর করা হতো। একদিন সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে হাতে গামছা বেঁধে ওপরের দিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এভাবে তাঁকে পাঁচ-সাত দিন জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনকারীরা বলত, তিনি জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত বলে স্বীকার করলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
সেলের ভেতর সব সময় তাঁকে হাত দুটি পেছনে নিয়ে শিকের সঙ্গে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বেঁধে রাখা হতো। এতে তাঁর দুই হাতের কবজিতে ঘা হয়ে যায়। সব সময় কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখার কারণে দুই চোখের পাশেও ঘা হয়ে যায়। তাঁকে সারাক্ষণ বসে থাকতে হতো। হাত বেঁধে রাখার কারণে শুতে পারতেন না, ঘুমাতে পারতেন না।
নাপিতের মন্তব্য ও পরবর্তী ঘটনা
এক মাস পর নাপিত এসে তাঁর চুল-দাড়ি কেটে দেন। নাপিত তাঁকে আস্তে আস্তে বলেন, তিনি (ভুক্তভোগী) খুব সৌভাগ্যবান। এখান থেকে কেউ বের হতে পারে না। ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে টঙ্গী মডেল থানায় সোপর্দ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তিনটি মামলা দেওয়া হয়। জেলে থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে আরও চারটি মামলা হয়। এর মধ্যে র্যাব দুটি, কাউন্টার টেররিজম একটি এবং ডিবি একটি মামলা দেয়। চারটি মামলায় খালাস পেয়েছেন এবং তিনটি মামলা এখনো চলছে তাঁর বিরুদ্ধে। থানায় হস্তান্তরের ২৫ মাস পর তিনি জামিনে বের হন।
আসামি ও মামলার বর্তমান অবস্থা
মাহমুদুল হাসান বলেন, তাঁকে গুম করার সঙ্গে জড়িত ছিল র্যাবের গোয়েন্দা শাখা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তৎকালীন সরকার। তিনি সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। এই মামলায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামি রয়েছে। এর মধ্যে ১০ আসামি ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো. কামরুল হাসান, মো. মাহবুব আলম, কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, আনোয়ার লতিফ খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম ও মো. সারওয়ার বিন কাশেম। আজ তাঁদের সাবজেল থেকে ট্রাইব্যুনালে এনে এজলাসে তোলা হয়।
আরও সাত আসামি পলাতক: ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এম খুরশীদ হোসেন, মো. হারুন অর রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।



