ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নিয়মিত ও ক্রমবর্ধমান হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশটির মুসলিমদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভারতে মুসলিমদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণের বিরুদ্ধে তারা শিগগির দেশব্যাপী আন্দোলনে নামবে। সম্প্রতি বোর্ডের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া
পার্সোনাল ল বোর্ডের মুখপাত্র এস কিউ আর ইলিয়াস বলেন, ভারতে মুসলিমদের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এ পরিস্থিতি তুলে ধরতে বোর্ড একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন বা নথি প্রকাশ করবে। বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশেষ করে বিজেপি–শাসিত রাজ্যগুলোয় মুসলিমদের নিশানা করে গণপিটুনি, ঘরবাড়ি উচ্ছেদ ও মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙচুরের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি অনুষ্ঠান ও স্কুলে নির্দিষ্ট স্লোগান বাধ্যতামূলক করা, মাদ্রাসাগুলোর ওপর আক্রমণ এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর চেষ্টার মতো বিষয়গুলো নিয়ে বোর্ড আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আন্দোলনের কাঠামো
আন্দোলন পরিচালনার জন্য ৩০ সদস্যের একটি জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করা হবে বলে জানান মুখপাত্র ইলিয়াস। এরপর রাজ্য স্তরের কমিটি এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করার জন্য বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন তৈরি করা হবে।
ক্রমবর্ধমান আক্রমণ
ভারতে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধ ও নাবালকদের ওপর শারীরিক হামলা চালিয়ে জোরপূর্বক ধর্মীয় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং সে দৃশ্য ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মসজিদ ও মাদ্রাসা ভাঙচুরের পাশাপাশি উন্নয়নের নামে মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোয় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি যোগী আদিত্যনাথের সরকার উত্তর প্রদেশের বেনারসের একটি প্রাচীন মসজিদ উচ্ছেদ করার নোটিশ দিয়েছে।
বাজেট কমানো ও রাজনৈতিক অসন্তোষ
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়নে বাজেট কমানোর অভিযোগও উঠেছে। গত মঙ্গলবার এক খবরে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গে এই খাতের বাজেট প্রায় অর্ধেক করে দেওয়া হয়েছে। পার্সোনাল ল বোর্ডের মতে, মুসলিমদের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও ধর্মীয় বিশ্বাস এখন চরম হুমকির মুখে। সব রাজনৈতিক দলের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে মুখপাত্র ইলিয়াস বলেন, ‘কংগ্রেসসহ সব দলের ওপরই আমরা অসন্তুষ্ট। মুসলিমদের সমস্যাগুলো নিয়ে এখন কেউই আর গুরুত্ব দিয়ে কথা বলছে না।’
মিডিয়ার ভূমিকা
তবে এসব খবর মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং কেবল মুসলিমদের পরিচালিত কিছু সংবাদমাধ্যমেই তা গুরুত্ব পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কামাল মাওলা মসজিদের প্রসঙ্গ
ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদের প্রসঙ্গ নিয়েও ল বোর্ডের বিশেষ অধিবেশনে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পঞ্চম শতকের প্রাচীন মসজিদটি নিয়ে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি রায় দিয়েছেন। রায়ে বলা হয়েছে, মসজিদটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে ওই মসজিদের নিচে দেবী সরস্বতীর মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে। সে আবেদনের ভিত্তিতেই আদালত মসজিদটির জন্য নতুন জায়গা নির্ধারণ করে তা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ রায়ের বিষয়ে ল বোর্ডের মুখপাত্র এসকিউআর ইলিয়াস বলেন, ‘এ মামলায় ঐতিহাসিক প্রমাণ, রাজস্ব নথি ও ঔপনিবেশিক আমলের সরকারি দলিলপত্র দাখিল করা হয়েছিল। এরপরও মসজিদটি সরাতে বলা হয়েছে। বিষয়টি আমাদের বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়েছে।’
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) নিয়ে উদ্বেগ
বৈঠকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বোর্ড জানিয়েছে, উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের পর এখন আসাম, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রেও ইউসিসি চালুর তোড়জোড় চলছে। এ বিধি চালু হলে ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনগুলো বাতিল হয়ে যাবে এবং সব নাগরিকের জন্য একটি একক আইনব্যবস্থা কার্যকর হবে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটি বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। এর ফলে বহুবিবাহের মতো ধর্মীয় রীতিগুলো নিষিদ্ধ বা সীমিত হয়ে যাবে। তবে ভারতের তফসিলি উপজাতিদের এ আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড মনে করে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংবিধানে কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়। মুসলিমদের জীবন, সম্পত্তি ও ধর্মপালনের অধিকার রক্ষায় বোর্ড একটি ‘অ্যাকশন কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী জুলাই মাসের শেষ দিকে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরুর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।



