সরকার বদলায়, আইনও বদলায়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর পুরোনো ছক বদলায় না। অভিযোগ ওঠার পর প্রায় একই ভাষায় ‘অস্বীকার’ আসে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং চট্টগ্রামে কারা হেফাজতে এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুর অভিযোগ আবারও সামনে এনেছে পুরোনো প্রশ্ন, আইন থাকলেও রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা মানুষের নিরাপত্তা ও জবাবদিহি কি বদলেছে?
ফরিদপুর থেকে চট্টগ্রাম: একই ছক, একই প্রশ্ন
ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে স্থানীয় আইন কলেজের শিক্ষার্থী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর পর তাকে আটকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, গত ২১ জুন বিকালে মধুখালী উপজেলার পৌরসদরের গোন্দারদিয়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রান্ত। তখন তার পরনে ছিল লুঙ্গি, কাঁধে একটি ল্যাপটপের ব্যাগ। এসময় সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি (স্থানীয়রা তাদের ডিবি পুলিশের সদস্য বলে দাবি করছেন) প্রান্তকে ঘিরে ধরেন।
ঘটনায় তার স্বজনরা ভেবেছিলেন, হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু অপেক্ষার শেষে আসে মৃত্যুর খবর। পরিবারের অভিযোগ, প্রান্তকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং সে কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, প্রান্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তদন্ত ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে পরিবারের প্রশ্ন, সুস্থ অবস্থায় হেফাজতে নেওয়া একজন তরুণ কীভাবে লাশ হয়ে ফিরলেন?
চট্টগ্রামে কারা হেফাজতে যুবলীগ নেতা নুরুল আলমের মৃত্যুর পরও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। পরিবারের দাবি, গ্রেফতারের সময় তিনি সুস্থ ছিলেন এবং হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
কোন সরকারের আমলে কত মৃত্যু?
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত দেশে হেফাজতে নির্যাতনের কারণে অন্তত ৪৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৪ হাজার ২৮৯। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, রাষ্ট্রের হেফাজতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার দীর্ঘ ইতিহাসও।
অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ছিল ১৮৪টি। যা মোট ঘটনার প্রায় ৩৮ শতাংশ। ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ছয়টি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়। এরপর ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক বা ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময়ে ছিল ৪২টি মৃত্যু।
সবচেয়ে বেশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ২১৩ জন হেফাজতে মারা যান। যা মোট ঘটনার প্রায় ৪৪ শতাংশ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, ৯ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত আরও ২৯টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ‘অধিকার’ বলছে, বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ জুন ২০২৬ পর্যন্ত আরও দুটি মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।
মৃত্যুর বাইরে বেঁচে থাকা মানুষের ক্ষত
হেফাজতে নির্যাতনের আলোচনায় সাধারণত মৃত্যু সামনে আসে। কিন্তু যারা বেঁচে ফেরেন, তাদের শরীর ও মনে থেকে যায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত। হেফাজতে নির্যাতনের শিকার ইমতিয়াজ হোসেন রকি সেই লড়াইয়ের একটি প্রতীক। ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীর ইরানি ক্যাম্প এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে রকি, তার ভাই ইশতিয়াক হোসেন জনিসহ কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে। রকির ভাষ্য, থানার ভেতরে তাদের নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে জনি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
২৬ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবে নির্যাতনবিরোধী এক আলোচনা সভায় রকি বলেন, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর অধীনে মামলা করতে পারা অল্প কয়েকজনের মধ্যে তিনি একজন। ক্ষতিপূরণ, বিচার ও দায়ীদের শাস্তির দাবিতে তাকে এক দশকের বেশি সময় লড়াই করতে হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তা ছাড়া সেই লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না বলেও জানান তিনি।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, নির্যাতন কেবল মারধর বা দৃশ্যমান আঘাত নয়। দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা, ঘুমাতে না দেওয়া, খাবার বা পানি থেকে বঞ্চিত করা, ভয় দেখানো, ক্রসফায়ারের হুমকি, পরিবারের সদস্যদের হুমকি, অপমানজনক আচরণ ও অস্বাস্থ্যকর হাজতে গাদাগাদি করে রাখাও নির্যাতনের অংশ।
আইন আছে, কার্যকারিতা কোথায়?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা এবং নির্যাতনমুক্ত থাকার নিশ্চয়তা দেয়। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন বা ক্যাটে যোগ দেয়। পরে প্রণীত হয় নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের পরিপূরক প্রটোকল ওপি-সিএটি স্বাক্ষর করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনের কার্যকর প্রয়োগই বড় প্রশ্ন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব, দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, দুর্বল মনিটরিং, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ঘাটতি প্রতিকারের পথ আটকে রাখে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয়। এর পেছনে আইনের দুর্বল প্রয়োগ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব এবং দায়ীদের জবাবদিহির ঘাটতিই প্রধান কারণ। ‘আইন বইয়ে থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দুর্বল। অভিযোগ উঠলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, আর বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়’, যোগ করেন তিনি।
শুধু ময়নাতদন্ত নয়, তদন্ত হোক পুরো হেফাজতকাল
হেফাজতে মৃত্যু ঘটলে শুধু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একজন ব্যক্তি কখন আটক হলেন, কোথায় ও কী অবস্থায় তাকে রাখা হলো, জিজ্ঞাসাবাদ কীভাবে হলো, পরিবার বা আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি না, সিসিটিভি সচল ছিল কি না, হাজত রেজিস্ট্রারে কী লেখা আছে এবং অসুস্থ হওয়ার পর কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে—পুরো হেফাজতকালই নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত ১৮ বছর বয়সী শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের মা মমতাজ বেগমের অভিজ্ঞতা আরও করুণ। একটি মৃত্যু কীভাবে পুরো পরিবারকে ভেঙে দেয়। ছেলেকে হারানোর পর তার স্বামীও তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। এখন তিনি নিজে ও ১০ বছর বয়সী মেয়ের দায়িত্ব একাই বহন করছেন।
মানবাধিকার কর্মী ইজাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিচারহীনতা শুধু আইনি ব্যর্থতা নয়, এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক বোঝা চাপিয়ে দেয়। একজনের মৃত্যু বা নির্যাতনের পর একটি পরিবার প্রিয়জনের পাশাপাশি হারাতে পারে উপার্জনের উৎস, সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক স্থিতি এবং রাষ্ট্রের ওপর আস্থা।
অধ্যাদেশ বাতিলের পর কী থাকবে?
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসেন স্বাধীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নির্যাতন আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং কোনও অবস্থাতেই এর বৈধতা নেই। বাংলাদেশের আইনগত কাঠামো থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তার মতে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বাতিলকৃত অধ্যাদেশগুলোর আদলে কার্যকর আইন প্রণয়ন করে সংসদে পাস করা, স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন এবং ওপি-সিএটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি।
মানবাধিকার কমিশন ও গুম-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, মূল প্রশ্ন কেবল কোন আইন বা অধ্যাদেশ বাতিল হলো তা নয়, বরং এর বদলে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে কি না। তিনি বলেন, কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া বিদ্যমান সুরক্ষামূলক কাঠামো বাতিল হলে মানবাধিকার রক্ষায় শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেভাবে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে, তাতে উদ্বেগ বাড়ছে যে কর্তৃত্ববাদের পতন হলেও ক্ষমতাকাঠামোতে, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত অনেকের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী চর্চার কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই হয়েছে শুধু পালাবদল, আর বিচারের নামে চলছে প্রতিশোধ।



