কারাগারে শিশুদের শৈশব: বন্দি মায়ের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ জীবন
কারাগারে শিশুদের শৈশব: বন্দি মায়ের সঙ্গেই জীবন

বিভিন্ন অভিযোগে দেশের কারাগারগুলোতে বন্দি রয়েছেন অসংখ্য নারী। তাদের অনেকের সঙ্গেই রয়েছে ছোট ছোট সন্তান। কারা বিধান অনুযায়ী, ছয় বছরের কম বয়সী শিশুরা মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকার সুযোগ পায়। ফলে কোনও অপরাধ না করেও বহু শিশুর শৈশব কাটছে কারাগারের চার দেওয়ালের ভেতরে। স্বাধীনতা, খোলা মাঠ, স্বাভাবিক শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশ, শৈশবের এসব মৌলিক উপাদান থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা বেড়ে উঠছে সীমাবদ্ধ এক বাস্তবতায়। নেই খেলাধুলার পর্যাপ্ত জায়গা, নেই খোলা আকাশের স্কুল জীবন; আছে নির্ধারিত রুটিন আর কঠোর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ।

শিশুদের মানসিক বিকাশে ঝুঁকি

সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জন্মের পর থেকেই তারা বন্দিত্বের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায় এবং সেই স্মৃতি নিয়েই পরবর্তীকালে বাইরের জীবনে প্রবেশ করে।

ছয় বছর পর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

নীতিমালা অনুযায়ী, ছয় বছর বয়স পূর্ণ হলে শিশুকে বন্দি মায়ের কাছ থেকে আলাদা করা হয়। কিন্তু তখন শুরু হয় নতুন সংকট— শিশুটি যাবে কোথায়? কে নেবে দায়িত্ব? অনেক ক্ষেত্রে স্বজনরা দায়িত্ব নিলেও কিছু শিশুর ঠিকানা হয় আশ্রয়কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিচ্ছিন্নতা শিশুদের মানসিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কারাগারের ভেতরের শৈশব

মায়ের সঙ্গে কারাগারে প্রবেশের পর শিশুদের নাম ও বয়স রেজিস্ট্রারে নথিভুক্ত করা হয়। তারা মায়ের সঙ্গেই নির্ধারিত সেলে থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী কারাগারের ডে-কেয়ার সেন্টারে পাঠানো হয়। শিশুদের তত্ত্বাবধানে থাকেন একজন নারী ডেপুটি জেলার। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার ও প্রয়োজনীয় পথ্যের ব্যবস্থা করা হয়। ডে-কেয়ারে সীমিত পরিসরে খেলাধুলার সামগ্রীও সরবরাহ করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কারা কর্মকর্তারা জানান, বন্দি নারীরা এখানে শুধু একজন কয়েদি নন, একজন মা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সন্তানের খাবার, ঘুম, অসুস্থতার সেবা, সবকিছু নিয়েই কাটে তাদের দিন। কঠোর নিয়ম ও নজরদারির মধ্যেও মাতৃত্বের অনুভূতি থেমে থাকে না।

কারাগারের বাস্তবতা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমিত পরিসরে নার্সারি ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কারাগারের পরিবেশ শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য অনুকূল নয়। ফলে তাদের আচরণ, মানসিকতা ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা যেন বুঝতে না পারে যে তাদের মা একজন বন্দি— সে ধরনের মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

মানবাধিকার কর্মীর মতামত

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, “নারী বন্দিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সন্তানসম্ভবা নারী ও শিশুসহ বন্দিদের অনেক সময় অন্য বন্দিদের সঙ্গেই থাকতে হয়।” তিনি বলেন, “অধিকাংশ কারাগারে শিশুদের জন্য আলাদা খেলাধুলার জায়গা নেই, নিয়মিত শিক্ষার সুযোগও সীমিত। শিশুদের মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি।” এই পরিস্থিতিতে বিচারাধীন বা কম ঝুঁকিপূর্ণ নারী বন্দিদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব দেন তিনি। থানায় নিয়মিত হাজিরা ও নজরদারির আওতায় রেখে জামিন দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও মত দেন। এছাড়া নারী বন্দিদের জন্য ‘মুক্ত কারাগার’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও দেন তিনি, যেখানে নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে চলাচলের সুযোগ থাকবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধান বজায় থাকবে।

কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

কারা মহাপরিদর্শক সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, “আইন অনুযায়ী মায়ের সঙ্গে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত সন্তান কারাগারে থাকতে পারে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে নারী বন্দিদের আলাদা রাখা সম্ভব হয় না।” তিনি জানান, সব কারাগারে এখনও শিশুদের জন্য প্লে-গ্রাউন্ড নেই। নতুন কারাগারগুলোতে শিশু-বান্ধব সুবিধা যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সন্তানসম্ভবা ও সন্তানসহ নারী বন্দিদের আলাদা কক্ষে রাখার ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।