পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকারকর্মী ইয়েন ইয়েনকে সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে 'অসত্য' ও 'বিভ্রান্তিকর' তথ্য তুলে ধরে অপপ্রচারের অভিযোগ এনে সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া হয়েছে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফী ৬ এপ্রিল এ চিঠি পাঠান। চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে ইয়েন ইয়েন আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁর আইনি পরামর্শকের মাধ্যমে তিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে চিঠির উত্তর দিয়েছেন। তবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ চিঠি পাননি বলে জানিয়েছেন। এভাবে একজন মানবাধিকারকর্মীকে সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়ার সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মীর প্রতিক্রিয়া
বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, 'এই চিঠি মানুষের কণ্ঠরোধ, মানুষের কথা বলার অধিকার প্রকারান্তরে পরোক্ষভাবে সংকুচিত করে দেওয়ারই একটা চেষ্টা বলে মনে করি, যা বিগত দিনেও পার্বত্য চট্টগ্রামে চালু ছিল। পার্বত্য এলাকার মানবাধিকার-সংক্রান্ত বক্তব্য যখন অধিকারকর্মীরা দিতেন, তখন এ ধরনের কণ্ঠরোধের চেষ্টা হতো। আমরা ক্রমান্বয়ে পূর্বের দিকে ফিরে যাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে।'
চিঠির মূল বক্তব্য
ইয়েন ইয়েন চাকমা সার্কেল প্রধান রাজা দেবাশীষ রায়ের স্ত্রী। চিঠিতে তাঁর এই পরিচয়ও তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার বিষয়ে তিনি সক্রিয়। জেলা প্রশাসকের চিঠিতে বলা হয়, ইয়েন ইয়েন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন উপজাতীয় সংগঠনের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ উত্থাপনপূর্বক অপপ্রচারে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানা গেছে। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এ ধরনের কার্যক্রম এ অঞ্চলের পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো বক্তব্য প্রদান বা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য
যোগাযোগ করা হলে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চিঠিটি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি স্মারকের সূত্রে। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পালন করেছেন। চিঠিটি নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের সমালোচনা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, 'আমি শুধু আমার কর্তব্য পালন করেছি। মানবাধিকারকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।'
ইয়েন ইয়েন ও তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য
জেলা প্রশাসকের চিঠির জবাবের বিষয়ে নিজে কোনো মন্তব্য করতে চাননি ইয়েন ইয়েন। তিনি এ বিষয়ে তাঁর আইনজীবী সারা হোসেনের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন। ইয়েন ইয়েনের পক্ষ থেকে গত শুক্রবার ই-মেইলে চিঠির জবাব দেওয়া হয়েছে বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, 'অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ ও ভিত্তিহীন কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে এখানে। এই চিঠির অনুলিপি বিভিন্নজনের কাছে পাঠানো হয়েছে। এটা তো আসলে মানহানিরও শামিল। জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করা হয়েছে যেন চিঠিটা বাতিল করা হয়।' সারা হোসেন আরও বলেন, 'আমরা যে সময়ের মধ্যে এখন আছি, যেখানে আমরা অনেক ধরনের হয়রানিমূলক পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসছি, সেখানে আবার কেন এ রকম অস্পষ্ট ধরনের নির্দেশনা দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হবে, সেটাও তো একটা প্রশ্ন।'



