নরসিংদীতে বিদ্যালয় অধ্যক্ষের উপর মব হামলা: মব সংস্কৃতির বিষবৃক্ষ এখনও দূর হয়নি
নরসিংদীতে বিদ্যালয় অধ্যক্ষের উপর মব হামলা, মব সংস্কৃতি এখনও দূর হয়নি

নরসিংদীতে বিদ্যালয় অধ্যক্ষের উপর মব হামলা: মব সংস্কৃতির বিষবৃক্ষ এখনও দূর হয়নি

সম্প্রতি নরসিংদীর রায়পুরায় সরকারি আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ নুর সাখাওয়াত হোসেন মিয়ার উপর এক বর্বরোচিত হামলা সংঘটিত হয়েছে। এই ঘটনাটি মব সংস্কৃতিরই এক কদর্য বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। একজন অধ্যক্ষ, যিনি সমাজের আলোকবর্তিকা ও মানুষ গড়ার কারিগর, তাকে একদল বহিরাগত উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি প্রকাশ্য দিবালোকে নিজ কর্মস্থলে লাঞ্ছিত করেছে। এমনকি তাকে টানিয়া হ্যাঁচড়াইয়া কক্ষ থেকে বাহির করার দুঃসাহসও তারা দেখিয়েছে।

শিক্ষকদের মর্যাদা হ্রাস ও সমাজের উদ্বেগ

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, একদা আমাদের সমাজে শিক্ষকগণ যে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, আজকের দিনে স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতার কারণে সেই সম্মান ধূলিসাৎ হচ্ছে। অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত করতে বর্তমান প্রজন্মের অনেকের বিবেকের দংশনও কাজ করছে না। যতদূর জানা যায়, এই হামলার মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির অপচেষ্টা। মব সৃষ্টিকারীরা পরিস্থিতিকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গুছাতে চায়, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য অশনিসংকেত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব সহিংসতার পরিসংখ্যান

গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে ‘মব’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ে সমগ্র দেশে বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টির মাধ্যমে অনেকে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হন, ঘটে হতাহতের ঘটনাও। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসের শাসনামলে বাংলাদেশে ৪১৩টি মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২৫৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩১৩ জন। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে, মব কালচারের সেই বিষবৃক্ষ আজও যে সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি, রায়পুরার এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মব সংস্কৃতি ও গণবিচারের সংজ্ঞা

মব বলতে সাধারণত কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে একত্রিত একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে বোঝায়, যারা সাময়িক আবেগের বশবর্তী হয়ে অথবা পরিকল্পিতভাবে সহিংসতায় লিপ্ত হয়। তারা অনেক সময় স্রেফ গুজবের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ হয়ে সহিংসতা চালায়। আর যখন সাধারণ মানুষ আইনি প্রক্রিয়া (পুলিশ, আদালত) উপেক্ষা করে কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গণপিটুনি, নির্যাতন বা হত্যার মাধ্যমে সরাসরি শাস্তি দেয়, তখন তাকে বলে 'মব জাস্টিস' বা ‘গণবিচার’। এর কোনো ধরনের আইনগত বৈধতা নেই, বরং এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ বা ‘মব সন্ত্রাস' হিসেবে গণ্য। এর মোকাবিলা করা বর্তমান সরকারের সময়ও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের ভূমিকা

সভ্য সমাজে আইনের শাসন যেখানে সর্বজনীন, সেখানে মব জাস্টিস হলো এক আদিম ও অসভ্য প্রথা, যা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাম্য হতে পারে না। দেশে বর্তমানে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অবস্থান বদলিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকলে আজ এই অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই এই মব সৃষ্টিকারীরা বারংবার সমাজকে অস্থির করে তুলছে। অথচ মব যারা সৃষ্টি করছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক এবং তারা নিজেদের যতই শক্তিশালী মনে করুক না কেন, রাষ্ট্রের শক্তির নিকট তারা নস্যি। রাষ্ট্র যদি কঠোর হস্তে এই অরাজকতা দমন না করে, তাহলে সমাজ অচিরেই এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবে।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং জনমনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মব কালচার বা অনুরূপ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা না হলে, সমাজ থেকে এই অপসংস্কৃতির অভিশাপ দূর করা সম্ভব হবে না। আমরা প্রত্যাশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে এই হামলার বিচার করে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবেন। এখানে দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতার দাপট যেন বিচারের পথে অন্তরায় না হয়। আমরা মনে করি, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারে এই মব সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা অপরিহার্য।