মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় যুবক হত্যা: রাতভর নির্যাতনের অভিযোগ
মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলায় এক যুবককে তার বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে রাতভর নির্যাতন করে হত্যার মর্মান্তিক অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (২০ এপ্রিল) ভোরে বালুরচর এলাকার নদীর পাড় থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় রাকিব নামের ওই যুবককে উদ্ধার করা হয়। তাকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
নিহত রাকিব (২২) গজারিয়া উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের আলমগীর হোসেনের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাউশিয়া ইউনিয়নের দড়ি বাউশিয়া গ্রামে একটি ভাড়া বাসায় একাকী বসবাস করতেন। নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, রোববার দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে তিনজন অপরিচিত যুবক একটি গাড়ি নিয়ে রাকিবের ভাড়া বাসায় উপস্থিত হয়।
তারা রাকিবকে ‘পিয়াস’ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করার কথা বলে জোরপূর্বক ডেকে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের আপত্তি সত্ত্বেও তারা নিজেদের রাকিবের ঘনিষ্ঠ পরিচিত বলে দাবি করে এবং সাক্ষাৎ শেষে তাকে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দেয়। তবে সারারাত অপেক্ষা করার পরও রাকিব আর বাড়ি ফেরেননি। এ সময় তার মোবাইল ফোনও সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
নিহতের মায়ের বেদনাদায়ক বর্ণনা
নিহত রাকিবের মা রুমি বেগম ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “রাতভর অপেক্ষা করেও ছেলেকে না পেয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। সকালে তার খোঁজে বের হয়ে জানতে পারি বালুরচর এলাকায় এক যুবককে ফেলে রাখা হয়েছে। সেখানে গিয়ে আমার ছেলেকে গুরুতর আহত অবস্থায় পাই। সে তখন ক্ষীণ কণ্ঠে জানায়, তাকে মারধর করা হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “কয়েকবার পানি খেতে চাওয়ার পর সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। এটি আমাদের পরিবারের জন্য একটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।”
অভিযুক্ত পিয়াসের প্রতিক্রিয়া ও দাবি
এ ঘটনায় অভিযুক্ত পিয়াস মুঠোফোনে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে দাবি করেছেন, তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “রাকিব ও তার মামা আমার পরিচিত। কাউকে ঘর থেকে বের করতে হলে শত্রুপক্ষ অনেক সময় পরিচিত নাম ব্যবহার করে। আমার ধারণা, প্রতিপক্ষই আমার নাম ভাঙিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে।” তিনি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
চিকিৎসক ও পুলিশের বক্তব্য
গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সোলায়মান সুজন জানান, নিহতের শরীরে বড় ধরনের কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অন্যদিকে, গজারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাসান আলী বলেন, নিহত যুবক স্থানীয় একটি কারখানায় কর্মরত ছিলেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রাতে তিন যুবক তাকে ডেকে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করব।”
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও তদন্তের অগ্রগতি
স্থানীয় বাসিন্দারা এই হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজন কয়েকজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে। তদন্ত দল নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা মুন্সীগঞ্জ জেলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী নিহতের পরিবারকে সহায়তা প্রদান এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারের জন্য কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে।



