প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন, যা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সফরটি ছিল তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর, যা মালয়েশিয়া হয়ে চীন গমনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের নজর
প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক বিশ্বের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত এ সফরের ওপর গভীর নজর রেখেছিল। উপমহাদেশে চীন-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং চীনের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর কৌশলগত সম্পর্ক ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, “বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কের পরিবর্তন লক্ষণীয়। অধিকাংশ সময় আমরা পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত নীতি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারিনি।”
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক পটভূমি
চীন স্বাধীন বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট স্বীকৃতি দেয় এবং একই বছরের অক্টোবরে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবার চীন সফর করেন এবং ১৯৮০ সালে দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি হিসেবে সফর করেন। এই সফর দুটির মাধ্যমে সামরিক ক্ষেত্রে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হয় এবং প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা আসে। তবে গত ১৫ বছরে ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির কারণে চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা শীতল ছিল। বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ থাকলেও প্রতিশ্রুত ৪০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক
প্রধানমন্ত্রীর সফরে ১৩টি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বিষয় নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে মোংলা সমুদ্রবন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পটি গুরুত্ব পেয়েছে।
মোংলা বন্দর সম্প্রসারণে চীনের সহায়তায় দুটি জেটি ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল। এর মধ্যে চীনের সহায়তা প্রায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা এবং বাকি অংশ বাংলাদেশ সরকারের। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় চার লাখ টিইইউ (২০ ফুট সমতুল্য কনটেইনার) হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। বর্তমানে মোংলা বন্দরে কোনো কনটেইনার বার্থ নেই; সব বার্থ বাল্ক কার্গোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করে প্রায় ২১৪ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়। তবে চীনের অর্থছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় কাজ শুরু হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর
চীনের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিসিআইএম উদ্যোগের নতুন সংস্করণ। করিডরটি বাংলাদেশকে চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াবে এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। চীন ভারতকেও এই করিডরে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল, এপিএম টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গুরুত্ব বহুগুণে বাড়বে। এই করিডর বাংলাদেশকে আসিয়ানের সঙ্গেও কার্যকরভাবে যুক্ত করবে।
কৌশলগত স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ
বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক ও কাম্য। তবে এ নীতির উদ্দেশ্য কোনো দেশের ক্ষতি করা নয়। বরং সবার সঙ্গে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আমাদের লক্ষ্য। আশা করি, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অব্যাহত রাখবে—এটাই দেশের জনগণের প্রত্যাশা।
এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মতামত লেখকের নিজস্ব।



