প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর শুরু, আজ আনুষ্ঠানিক বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর শুরু

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। সঙ্গে সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। গতকাল দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা হয়ে স্থানীয় সময় রাত পৌনে নয়টায় কুয়ালালামপুরে পৌঁছান। সেখানে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তাকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলকিফলি হাসান ও তাঁর সহধর্মিণী।

আজকের কর্মসূচি

আজ সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে পুত্রজায়ায় আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসবেন। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

প্রধানমন্ত্রী প্রথমে একান্তে ও পরে প্রতিনিধি পর্যায়ে বৈঠক করবেন। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সমঝোতা স্মারকসহ বেশ কয়েকটি দলিল সইয়ের কথা রয়েছে। এরপর তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আজ বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া তাঁর সম্মানে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সফরসঙ্গী ও বাণিজ্যিক আলোচনা

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।

আজ দুপুরে কুয়ালালামপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পৃথকভাবে দেখা করার কথা রয়েছে। এমএমসি পোর্টসের চেয়ারম্যান তাজু্উদ্দিন আতান, এয়ার এশিয়ার চেয়ারম্যান জামালউদ্দিন ইব্রাহিম ও পেট্রোনাস গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ বাকী সালেহ—এঁদের সঙ্গে বাংলাদেশে বন্দর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে।

প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর কেন মালয়েশিয়া

ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পর তারেক রহমান প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে গেলেন। ভারত, মালয়েশিয়া ও চীন—তিন দেশই তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং ভারত-চীন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় সরকার দিল্লি বা বেইজিংয়ের পরিবর্তে তৃতীয় একটি দেশ বেছে নেয়।

কূটনীতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রথম সফরের গন্তব্য নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের প্রতীকী বার্তা বহন করে। মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়াকে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘সামগ্রিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া ইতিবাচক। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা উত্তরোত্তর বাড়ছে।’

শ্রমবাজার ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা

এক দশক ধরে বিদেশে বাংলাদেশের নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য মালয়েশিয়া। দেশটিতে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। তবে মালয়েশিয়ার নতুন শিল্পনীতি এনআইএমপি ২০৩০-এর কারণে কর্মী নিয়োগের ধরন পাল্টাচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার নতুন শিল্পনীতির কারণে দেশটিতে কর্মী নিয়োগের চিরাচরিত ধরন পাল্টে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যে ধরনের কর্মী পাঠায়, সেই বাজার সংকুচিত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ও আধা দক্ষ কর্মী নিয়োগের বিষয়ে আমরা যোগাযোগ শুরু করেছি। বিশেষ করে বাংলাদেশের কর্মীদের সুরক্ষা এবং কল্যাণের বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

শিক্ষা খাতে সহযোগিতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অন্তত ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, যা বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম শিক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন মাত্রা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ, যিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়া ও মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেছেন, তাঁর মতে, ‘দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু প্রবাসী শ্রমের কাঠামোয় না দেখে দক্ষতা, শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশীদারত্বের প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। মালয়েশিয়া যদি উচ্চ আয়ের দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণ করতে চায়, তাহলে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকস শিল্প এবং উৎপাদন খাতে দুই দেশের সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রীর সফরে আসিয়ান ও আরসেপে বাংলাদেশের যুক্ততার বিষয়েও মালয়েশিয়ার সক্রিয় সহযোগিতা চাওয়া হবে। দুই দেশের সম্পর্ক ১৯৭২ সাল থেকে শুরু। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানেও মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পাশে আছে।