১১৫ দিন পর হরমুজ প্রণালি পার হলো ‘বাংলার জয়যাত্রা’, ৩১ নাবিক নিরাপদে ফিরছেন
১১৫ দিন পর হরমুজ প্রণালি পার হলো ‘বাংলার জয়যাত্রা’

ইরান যুদ্ধে আটকে পড়া ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক নিয়ে এমভি বাংলার জয়যাত্রা গতকাল সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। এর আগে তিন দফায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অনুমতি চেয়েও ব্যর্থ হয়েছিল জাহাজটি। তবে ১১৫ দিনের মাথায় সেই অপেক্ষার অবসান হলো।

যুদ্ধের শুরুতে আটকা পড়েছিল জাহাজটি

ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পণ্য পরিবহনে ছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজটি। যুদ্ধের পর ইরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় দেশটি। তখন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদে জাহাজ ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি। কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু হলেও তিন দফা চেষ্টায় জাহাজটি হরমুজ অতিক্রম করতে পারেনি।

জাহাজটি সিঙ্গাপুরের জাহাজ চার্টার দাবা প্রাইভেট লিমিটেডের অধীনে চলছিল এবং এতে ছিল ৩৭ হাজার টন সার, যা সৌদি আরব থেকে রপ্তানি করে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠানোর কথা ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৌশলে হরমুজ পার হওয়ার বর্ণনা

কীভাবে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে এমভি বাংলার জয়যাত্রা, তার বর্ণনা প্রথম আলোকে দিয়েছেন জাহাজটির মাস্টার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ফুজাইরা বন্দরের দিকে জাহাজটি নেওয়ার সময় তিনি হোয়াটসঅ্যাপে বলেন, ‘পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা এমটি নর্ডিক পোলক্স রোববার হরমুজ অতিক্রম করে। সৌদি আরব থেকে তেল নিয়ে এটি বাংলাদেশের দিকে রওনা হয়। এই ট্যাংকারটি পার হওয়ার পর বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের এমডি স্যার (ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক) আমার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে আলাপ করেন। কীভাবে হরমুজ পার হওয়া যাবে, তা নিয়ে আলাপ হয়। তিনি সাহস দেন এবং কৌশলের কথা জানান।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আবার সিঙ্গাপুরের চার্টার প্রতিষ্ঠানকেও (যারা বিএসসির জাহাজটি ভাড়া নিয়েছে) আমি বিষয়টি জানাই। তারা লিখিতভাবে আমাকে জানায়, ফুজাইরা বন্দরের দিকে রওনা হতে। ইরানের কোস্টগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করার কথাও বলা হয়। সে সময় বেতারবার্তায় ইরানের বাহিনী হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল, যাতে কোনো মিলিটারি ভেসেল এই প্রণালি পার না হয়। তাহলে ধ্বংস করা হবে।’

যোগাযোগের চেষ্টা ও দুঃসাহসিক যাত্রা

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জাহাজের মালিক এবং চার্টারার প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ পেয়ে আমরা গতকালই পারস্য উপসাগরে নোঙর এলাকা থেকে রওনা হই। হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার আগে বেতারবার্তায় ইরানের বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। অনেকবার যোগাযোগ করার পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ সময় আমাদের আগে-পরে কয়েকটি জাহাজ হরমুজ পার হচ্ছিল। আমরা ধীরে ধীরে অগ্রসর হই, যাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা এলে জাহাজটি দ্রুত নোঙর করতে পারি।’

নিজেদের এই যাত্রা দুঃসাহসিক ছিল জানিয়ে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের কাছ ঘেঁষে জাহাজগুলো চলাচল করছে। অনুমতি পাওয়া জাহাজগুলোকেও ইরানের বাহিনী ওই পথ ধরে চলাচলের নির্দেশনা দিয়ে আসছে। আমরাও ওই পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। ইরানের বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও পাইনি। আমাদের ভয় হচ্ছিল। ভীতিকর অবস্থা ছিল, যদি কোনো কারণে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। কারণ, ওপরে ড্রোনের ভয়, আর নিচে মাইন কিংবা ছোট সাবমেরিনের ভয়। মনে হচ্ছিল, দুঃসাহসিক কোনো অভিযান পরিচালনা করছি।’ জাহাজের ক্যাপ্টেন আরও বলেন, ‘তবে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে আমরা নিরাপদে হরমুজ অতিক্রম করি। কোনো সমস্যা হয়নি।’

প্রধান প্রকৌশলীর বর্ণনা ও পরবর্তী পরিকল্পনা

জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পারস্য উপসাগর থেকে ইরানের উপকূলের কাছাকাছি ঘেঁষে হরমুজ অতিক্রমে আমাদের সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। একই চার্টারার প্রতিষ্ঠানের সি–ঈগল নামের একটি জাহাজও হরমুজ পার হয়েছে। জাহাজটি বাংলাদেশ সময় বিকেল চারটার দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে নোঙর করে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করবে। দুই দিন পর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরের উদ্দেশে রওনা হবে।’

বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ অতিক্রম করার আগে বিষয়টি গোপন রাখা হয়। জাহাজটি অতিক্রম করার সময় রাতভর নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানসহ মন্ত্রণালয় ও বিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিকভাবে জাহাজের প্রতিমুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। হরমুজ পার হওয়ার পরই রাত সাড়ে তিনটায় বিএসসি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিষয়টি জানায়। তবে বিএসসির কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, হরমুজ পার হওয়ার জন্য ইরানের বাহিনীকে কোনো টোল দিতে হয়নি।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘নৌ কলাকৌশল কাজে লাগিয়েই জাহাজের নাবিকদের প্রচেষ্টায় হরমুজ পার হয়েছে বাংলার জয়যাত্রা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনাও কাজে লেগেছে।’