কারাগারে থাকা সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আদালতকে জানিয়েছেন, তিনি লাল ও সবুজ খাতা সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে বিচারক, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং কর্তৃপক্ষের কার্যকলাপ লিপিবদ্ধ করছেন। সোমবার (২২ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের আদালতে জুলাই আন্দোলনের সময় মো. মোখলেছিন নামে এক ব্যক্তিকে হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর শুনানিতে এ কথা বলেন ইনু।
মামলার পটভূমি ও গ্রেফতার দেখানোর আবেদন
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আশরাফ হোসেন ১৮ জুন মামলার দুই আসামি হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন। আদালত আসামিদের উপস্থিতিতে শুনানির দিন ধার্য করেন সোমবার। এদিন শুনানিকালে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। হ্যান্ডকাপ, মাথায় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে এজলাসে তোলা হয় এবং আসামির কাঠগড়ায় রাখা হয়।
শুনানিতে ইনুর বক্তব্য
শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের কেন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে তা আদালতকে জানান। এরপর ইনুর আইনজীবীরা দাবি করেন, তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এবং বয়স্ক ও অসুস্থ বিবেচনায় তাদের গ্রেফতার না দেখানোর প্রার্থনা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ গ্রেফতার দেখানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, “ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর তারা। হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করার সবই করেছিলেন। তারা ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রী, এমপিও ছিলেন। এমন কোনও অন্যায় নাই যে করেননি। তাদের এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর প্রার্থনা করছি।”
এরপর আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে চান ইনু। অনুমতি পেলে তিনি বলেন, “ঘটনার এক বছরেরও বেশি সময় পর তদন্ত কর্মকর্তা আবিষ্কার করলেন, আমি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। আমাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করলেন।” তিনি তদন্ত কর্মকর্তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি তার দায়িত্বে অবহেলা করেছেন এবং এত দিনেও মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেননি।
স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ ও আদালতের সমালোচনা
দুঃখ প্রকাশ করে ইনু বলেন, “আমি সংকটাপন্ন হৃদরোগের রোগী। আমার ডায়াবেটিসও রয়েছে। সকালে আমাদের নিয়ে আসা হয়। সাড়ে চার ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও কোনও খাবার দেওয়া হয়নি। এতে আমি আমার জীবন বিপন্নের আশঙ্কা করছি। যে কোনও সময় বড় ধরণের একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।” তিনি আদালতের অবহেলার কারণে এত দীর্ঘ সময় হাজতখানায় বসে থাকতে হয়েছে বলে প্রশ্ন তোলেন।
ইনুর বক্তব্যের বিরোধীতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ। তাকে ধমক দিয়ে ইনু বলেন, “আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলছি। আপনার সঙ্গে না।” বিচারক দুই জনকেই শান্ত করার চেষ্টা করেন।
গণতন্ত্র ও লাল-সবুজ খাতার প্রসঙ্গ
পুনরায় কথা বলার অনুমতি পেয়ে ইনু বলেন, “ড. ইউনূস ক্ষমতায় থাকাকালে বলেছিলেন, গণতন্ত্রের সুবাতাস বইছে। সেই সুবাতাস কি আদালত পাড়ায় আসেনি? আদালত এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা শাখা হিসেবে কাজ করছে। আপনার মাধ্যমে (বিচারক) প্রধানমন্ত্রীকে বলবো, তিনি অনেক জায়গায় গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু আদালতপাড়ায় এখনও গণতন্ত্র আসেনি।”
ইনুর এমন বক্তব্যে আপত্তি তোলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। তাকে ধমকের সুরে ইনু জানান, “আমি আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলছি। আপনার সঙ্গে বলছি না।”
এ পর্যায়ে ইনু বলেন, “আমি যেখানে (কারাগারে) আছি, জেলখানায় আছি। একটা সবুজ খাতা ও একটা লাল খাতা তৈরি করেছি। সেখানে আমি ২২ মাস ধরে আদালতের কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী কী করছে, প্রশাসনের কে কী করেছে, কোন কর্তৃপক্ষ কী করছে তা লিপিবদ্ধ করেছি। আদালত আমাদের সাড়ে চার ঘণ্টা হাজতখানায় বসিয়ে রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানি করেছে। আমার জীবন বিপন্ন করেছে। অনেক ধন্যবাদ, আমার বক্তব্য ধৈর্য ধরে শোনার জন্য।”
রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিবাদ
ইনুর এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান হারুন অর রশীদ। তিনি আদালতকে বলেন, “তার এ বক্তব্য আদালত অবমাননার শামিল। লাল খাতা ও সবুজ খাতার কথা বলে আদালতকে হুমকি দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রার্থনা করছি।”



