ইসরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুমকি সাবেক নেতাদের
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইনি হুমকি সাবেক নেতাদের

সাবেক নেতাদের কঠোর হুঁশিয়ারি

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাসবাদ ও জাতিগত নির্মূলের আদর্শকে সমর্থন করার অভিযোগে ইসরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন দেশটির সাবেক রাজনৈতিক নেতা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। ফাঁস হওয়া এক চিঠিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে দেওয়া ওই চূড়ান্ত সতর্কবার্তামূলক চিঠিতে ইসরায়েলের দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশটির সব গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক প্রধানেরা, সাবেক বিচারক, একজন নোবেলজয়ী ও খ্যাতিমান উপন্যাসিক স্বাক্ষর করেছেন।

চিঠিতে কী বলা হয়েছে?

স্বাক্ষরকারীরা ইহুদি সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। চিঠিতে ইসরায়েলের বেসামরিক ও সামরিক সদস্যদের হাতে সংঘটিত বছরের পর বছর ধরে চলা হামলার একটি তালিকাও তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে হত্যা, যৌন নিপীড়ন, চুরি, অগ্নিসংযোগ এবং মৃতদেহের অবমাননার মতো অপরাধ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এসব অপরাধ প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তির মধ্যে ঘটেছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে গাজা উপত্যকায় চালানো চরম সহিংসতা ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করছে এবং বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ উসকে দিচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিঠিতে বলা হয়, ‘এ চিঠি শেষবারের মতো দেওয়া একটি সতর্কবার্তা। আমরা দাবি করছি, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জুডিয়া ও সামারিয়ায় (অধিকৃত পশ্চিম তীরের জন্য ব্যবহৃত ইসরায়েলি নাম) ছড়িয়ে পড়া ইহুদি সন্ত্রাসবাদ অবিলম্বে নির্মূলে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিন।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনি পদক্ষেপের হুমকি

চিঠিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, তাঁর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তামন্ত্রী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ডাররা যদি এ সহিংসতার নিন্দা না করেন এবং তা বন্ধ না করেন, তাহলে স্বাক্ষরকারীরা ইসরায়েলের উচ্চ আদালতে যাবেন।

চিঠিটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে। গার্ডিয়ান চিঠিটির একটি অনুলিপি দেখেছে।

স্বাক্ষরকারীদের তালিকা

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট ও এহুদ বারাক, প্রতিরক্ষা ও বিচারবিষয়ক দায়িত্ব পালন করা চার সাবেক মন্ত্রী এবং ৩০ জনের বেশি সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে সেনাবাহিনীর দুই সাবেক চিফ অব স্টাফ, মোসাদ, শিন বেত ও পুলিশের সাবেক প্রধানেরাও রয়েছেন।

রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিভাগের বাইরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ঔপন্যাসিক ডেভিড গ্রসম্যান, রসায়নে নোবেলজয়ী ডেভিড কর্নবার্গ, একজন অস্কারজয়ী এবং ইসরায়েলের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাপ্রাপ্ত ১০ ব্যক্তি।

সহিংসতার পরিসংখ্যান

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা অন্তত ১ হাজার ১০০ ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে। নিহত মানুষের অন্তত এক-চতুর্থাংশ শিশু। এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো ঘটনার জন্য এখন পর্যন্ত কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি।

সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ

চিঠিতে নেতানিয়াহু ও তাঁর কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাঁরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাতে উৎসাহ দিচ্ছেন, যাতে জাতিগত নির্মূল ও ভূখণ্ড সংযুক্তিকরণের চরমপন্থী রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা যায়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, এটি কেবল সেনাবাহিনী বা পুলিশের ব্যর্থতা নয়। এটি সাধারণভাবে ইসরায়েল সরকার ও প্রধানমন্ত্রী এবং বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের প্রকাশ্য নীতির বাস্তবায়ন।

চিঠিতে আরও বলা হয়, তাঁরা সেনাবাহিনী, পুলিশ ও শিন বেতকে ইহুদি অপরাধীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। কারণ, জুডিয়া ও সামারিয়ায় জাতিগত নির্মূল চালিয়ে ভবিষ্যতে ওই অঞ্চল সংযুক্ত করার যে সরকারি পরিকল্পনা চলছে, এসব ভয়াবহ ঘটনা তা বাস্তবায়নে কাজ করছে।

ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ

চিঠিতে ইউরোপে ইহুদিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ঐতিহাসিক হামলার সঙ্গেও তুলনা টানা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘অধিকৃত ভূখণ্ডে ইহুদি সন্ত্রাসবাদের অপরাধগুলো উনিশ ও বিশ শতকে পূর্ব ইউরোপে আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ ও সংগঠিত হামলার কথা মনে করিয়ে দেয়।’

সেনাবাহিনীর ভূমিকা

চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহযোগী ভূমিকা পালন করছে। কিছু জায়গায় তারা হস্তক্ষেপ করেনি, আবার কোনো কোনো ঘটনায় সরাসরি সহিংসতায় অংশ নিয়েছে।

হামলাকারীদের মধ্যে ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ইউনিটের সদস্য, আংশিক সামরিক পোশাক পরা ব্যক্তি এবং সক্রিয় দায়িত্বে না থাকলেও সেনাবাহিনী বা জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া অস্ত্রধারী ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

নিরাপত্তা ঝুঁকি

চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে, এসব হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করছে। কারণ, এর ফলে ফিলিস্তিনিদের প্রতিশোধমূলক হামলা কিংবা ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে নতুন গণ-অভ্যুত্থান বা ইনতিফাদা শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

চিঠির গুরুত্ব

স্বাক্ষরকারীদের অনেকে এর আগেও প্রকাশ্যে পশ্চিম তীরের সহিংসতার নিন্দা করেছেন। তবে আইনজীবী শমুয়েল বারকোভিটজের খসড়া করা এই চিঠি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি বৃহৎ একটি গোষ্ঠীকে এক করেছে, সেনাবাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা আলোচনায় এনেছে এবং প্রথমবারের মতো আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছে।

সরকারের প্রতি প্রশ্ন

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল আভি ব্লুথকে উদ্দেশ করে চিঠিতে বলা হয়, ‘ইহুদি সন্ত্রাসীদের নেতা কারা এবং তাঁরা কোথায় থাকেন, তা আপনারা ভালো করে জানেন। তাঁদের সংখ্যা কয়েক শ বলে ধারণা করা হয়। তারপরও কেন আপনারা ইহুদি সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে সফল হননি?’

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সরকার আর্থিক, রাজনৈতিক ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে এ সহিংসতাকে উৎসাহ দিচ্ছে। একই সঙ্গে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে হামলাকারীদের বিচারের বাইরে রাখছে।

চিঠিতে নেতানিয়াহুরও সরাসরি সমালোচনা করা হয়েছে। গত বছর তিনি ‘বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কিছু কিশোরের কাজ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু চিঠিতে নেতানিয়াহুর এ দাবির সঙ্গে ‘বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ, সেনাপ্রধান এয়াল জামির, শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনি ও পুলিশ কমিশনার ড্যানিয়েল লেভিকেও চিঠিতে প্রশ্ন করা হয়েছে।

চিঠি সম্পর্কে মন্তব্য জানতে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা জবাব দিতে রাজি হয়নি।