বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কের নতুন মাইলফলক: পিসিএ চুক্তির প্রাথমিক স্বাক্ষর সোমবার
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে রাজনৈতিক অংশীদারত্বের দিকে উত্তরণের পথে একটি ঐতিহাসিক ধাপ অগ্রসর হতে যাচ্ছে। অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ)-এর প্রাথমিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই উত্তরণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। আগামীকাল সোমবার ব্রাসেলসে ইইউ সদর দপ্তরে দুই পক্ষ এই প্রাথমিক স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে, যা কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাথমিক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি ও বৈঠকের বিস্তারিত
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ব্রাসেলস সফরে যাচ্ছে, যেখানে তিনি ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি–বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কাল্লাসের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এই বৈঠকের পরই পিসিএ চুক্তির প্রাথমিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে পাঁচ দফা আলোচনা শেষে দুই পক্ষ ৮৩টি ধারা সংবলিত চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম দেশ হিসেবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলাম এবং ইইউর পক্ষে জোটের এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা প্যাম্পালোনি প্রাথমিক স্বাক্ষর করবেন। প্রাথমিক স্বাক্ষর ইংরেজিতে হওয়ার পর চুক্তিটি ইউরোপের ২৪টি ভাষায় অনূদিত হবে, এবং এরপর ইইউর ২৭টি দেশ চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, চুক্তিটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মাধ্যমে চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত হবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো আশা করছে যে, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়ে বাস্তবায়ন শুরু হবে।
পিসিএ চুক্তির তাৎপর্য ও বিষয়বস্তু
২০০১ সালে ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত সহযোগিতা চুক্তিটি মূলত উন্নয়ন সহযোগিতাকেন্দ্রিক ছিল, যেখানে অর্থনীতি, উন্নয়ন, সুশাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু নতুন পিসিএ চুক্তি আইনগত বাধ্যতামূলক চুক্তি হিসেবে কাজ করবে, যা ইইউ ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার একটি বিস্তৃত রূপরেখা প্রতিষ্ঠা করবে। এই চুক্তির আওতায় প্রায় ৩৫টি খাত রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- বাণিজ্য ও বিনিয়োগ
- অর্থনৈতিক সহযোগিতা
- গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার
- শ্রম অধিকার ও সংযুক্তি
- প্রতিরক্ষা ও ইন্টারনেট নিরাপত্তা
- জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি
- মৎস্য ও কৃষি
- দক্ষ অভিবাসন
এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমর্থন করা, একটি শক্তিশালী মুক্তবাজার অর্থনীতি গড়ে তোলা, ব্যবসা ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাণিজ্য সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করা। পিসিএ সই হলে পূর্ববর্তী সহযোগিতা চুক্তিটি আর কার্যকর থাকবে না, যা সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা করবে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশ-ইইউর মধ্যে সম্পর্কের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে পিসিএর বিষয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান পরিস্থিতির কারণে আলোচনা স্থগিত রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে, ইইউ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে পিসিএ সই করার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল। এখন বিএনপির নতুন সরকারের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, যা কূটনৈতিক মহলে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রাসেলস সফরের সময় ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে, যার মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতায় সমর্থনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এই চুক্তিটি বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ককে উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে রাজনৈতিক অংশীদারত্বে উত্তরণের দিকে নিয়ে যাবে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



