ট্রাম্পের জামাতা কুশনার ও উইটকফের উপর চাপ: একই দিনে ইরান ও ইউক্রেন সংকট সমাধানের দায়িত্ব
ট্রাম্পের জামাতা কুশনার ও উইটকফের উপর চাপ: ইরান-ইউক্রেন সংকট

ট্রাম্পের জামাতা কুশনার ও উইটকফের উপর চাপ: একই দিনে ইরান ও ইউক্রেন সংকট সমাধানের দায়িত্ব

বিশ্বজুড়ে চলমান জটিল সমস্যা সমাধানে নিজের পছন্দের দুই দূতকে মাঠে নামিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই দুই ব্যক্তি হলেন তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। গত মঙ্গলবার একই দিনে ইরান সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছেন তাঁরা। এই অতি ব্যস্ততা ও একসঙ্গে দুই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামলানোর চেষ্টায় কূটনৈতিক মহলের অনেকেই বিস্মিত ও সংশয় প্রকাশ করেছেন।

জেনেভায় একই দিনে দুই আলোচনা

মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন উঠেছে—এই আলোচনা ঘিরে কুশনার ও উইটকফ কি অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছেন? এমন চাপের মুখে তাঁরা কি সমস্যা সমাধানে সক্ষম হবেন? আর যদি সক্ষমতা কমেই যায়, তাহলে সমাধানের বাস্তব সম্ভাবনা কতটা থাকবে?

গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসেন ট্রাম্প। প্রথম এক বছরেই একাধিক যুদ্ধ থামানোর দাবি করেছেন তিনি। নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে তিনি আরও শান্তিচুক্তি করতে আগ্রহী। সে লক্ষ্যে ইরান ও ইউক্রেনের মতো দীর্ঘ সময় ধরে চলা ইস্যু নিয়ে দ্রুত আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু জেনেভাতেই একসঙ্গে কেন এ আয়োজন, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশেষজ্ঞদের সংশয়

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘ট্রাম্প মনে হয় গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। বিস্তারিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বদলে তিনি ফলাফলের সংখ্যা বাড়াতে চাইছেন। একই জায়গায় একই সময়ে দুই বিষয় নিয়ে কাজ করা যৌক্তিক মনে হয় না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জেনেভায় মার্কিন দল ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে সাড়ে তিন ঘণ্টার পরোক্ষ আলোচনা হয়। দুই পক্ষই কিছু অগ্রগতির কথা বললেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দ্রুত কোনো চুক্তি হবে—এমন ইঙ্গিত মেলেনি। যত দিন এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলবে, তত দিন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারবেন ট্রাম্প। এর অর্থ হলো সেখানে উত্তেজনা বাড়বে।

কূটনৈতিক কাঠামো দুর্বল

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলসহ সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোতে কাটছাঁট করায় কুশনার ও উইটকফের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দুই দিনের বৈঠকের প্রথম দিনের আলোচনা শুরু করে মার্কিন দল। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি এক দিনেই এই যুদ্ধ শেষ করবেন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এটি। তবে যুদ্ধ থামাতে সাম্প্রতিক আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতির আশা খুবই কম ছিল।

ইরানের ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, জেনেভায় মার্কিন দলের দুটি আলোচনা ওয়াশিংটনের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। এতে অতিরিক্ত চাপের ঝুঁকি রয়েছে। যেন জরুরি বিভাগের একটি কক্ষে দুজন গুরুতর অসুস্থ রোগী, আর একজন মাত্র চিকিৎসক—যিনি কাউকেই যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না। এতে ব্যর্থতার সম্ভাবনা বাড়ে।

অভিজ্ঞতার অভাব

বৈরুতভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের মোহানাদ হাজ-আলী বলেন, ইরান সংকট এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে যুক্তরাষ্ট্রের এভাবে কূটনীতি চালানো ঠিক নয়। উইটকফ ও কুশনারকে যেন বিশ্বের সব সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা সত্যিই বিস্ময়কর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন ব্যবসাজগৎ থেকে এসেছেন কুশনার ও উইটকফ। শান্তি আলোচনায় তাঁদের অতটা অভিজ্ঞতা নেই। অপরদিকে আব্বাস আরাগচি বা রাশিয়ার কূটনীতিকদের গভীর জ্ঞান রয়েছে। ফলে তাঁদের মুখোমুখি হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা নেই কুশনার ও উইটকফের। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি জেনেভায় উপস্থিত ছিলেন না।

হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ইউক্রেনে হত্যাযজ্ঞ বন্ধের জন্য একটি শান্তিচুক্তি করতে ট্রাম্প ও তাঁর দল অন্য যেকোনো কারও চেয়ে বেশি কাজ করেছেন। যদিও মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই উইটকফ ও কুশনারের ভূমিকার পক্ষে যুক্তি দিয়ে আসছেন। তাঁরা বলেন, দুজনই দক্ষ চুক্তিকারক। ট্রাম্প তাঁদের ওপর আস্থা রাখেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলসহ সরকারের পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোতে কাটছাঁট করায় কুশনার ও উইটকফের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাবেক মার্কিন উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘আমাদের কূটনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে গেছে। তাই প্রশ্ন উঠছে—এই বড় বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার মতো সঠিক লোকজন এখন আমাদের আছে কি না।’