হোয়াইট হাউসের সংবাদিকদের নৈশভোজে হামলার ঘটনা সাজানো নাটক ছিল কি না, তা নিয়ে খোদ মার্কিন নাগরিকদের মনেই তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নতুন জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মধ্যে একজন মনে করেন, হোয়াইট হাউসের সাংবাদিক প্রতিনিধিদের বার্ষিক নৈশভোজে গত এপ্রিল মাসে ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বা সাজানো ছিল। অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান নিউজগার্ডের একটি জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন হিলটনে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাটি নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসির একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি ইতিমধ্যে অভিযুক্ত বন্দুকধারী কোল টমাস অ্যালেনকে অভিযুক্ত করেছে। তার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টাসহ চারটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এই গ্রেপ্তারের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ইন্টারনেটে দ্রুত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে।
জরিপের ফলাফল
নিউজগার্ড ও ইউগভ-এর যৌথ উদ্যোগে গত ২৮ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত ১ হাজার মার্কিন নাগরিকের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ২৪ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ওয়াশিংটন হিলটনের ওই ঘটনাটি ভুয়া বা সাজানো ছিল। এর বিপরীতে ৪৫ শতাংশ মানুষ এটিকে সত্য বা বৈধ ঘটনা হিসেবে বিশ্বাস করেন। বাকি ৩২ শতাংশ নাগরিক এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত মত দিতে পারেননি।
এই জরিপে আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে প্রতি তিনজনে একজন (প্রায় ৩৩ শতাংশ) এই ঘটনাটিকে সাজানো বলে মনে করেন, যেখানে রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র আটজনে একজন (প্রায় ১২ শতাংশ)। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের (১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী) মধ্যে এই ঘটনাটিকে সাজানো মনে করার প্রবণতা বয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
এই ধরনের সংশয় ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উত্থানকে মার্কিন সমাজ ও রাজনীতির গভীর সংকটের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। নিউজগার্ডের সম্পাদক সোফিয়া রুবিনসন জানান, এই ফলাফল খুবই উদ্বেগজনক এবং এটি সরকার ও গণমাধ্যমের প্রতি মার্কিন নাগরিকদের সামগ্রিক অনাস্থার প্রমাণ দেয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব পক্ষের মানুষের মধ্যেই বর্তমান প্রশাসন ও মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতি একধরনের অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। ফলে মানুষ খুব সহজেই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া যাচাইহীন তথ্যের ওপর ভরসা করছে।
এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল এক বিবৃতিতে এই প্রসঙ্গে জানান, যারা মনে করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই নিজের ওপর এই হত্যাচেষ্টার নাটক সাজিয়েছেন, তারা পুরোপুরি বোকা।
সংবাদমাধ্যমের অপব্যবহার ও অপপ্রচার নিয়ে গবেষণারত বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোয়ান ডনোভান অবশ্য এই অবিশ্বাসের পেছনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘরানার একটি প্রভাব দেখছেন। তিনি জানান, ট্রাম্পের পুরো শাসনকাল জুড়েই নাটকীয়তার একটি বড় ভূমিকা ছিল। তাই সংবাদিকদের নৈশভোজে হামলার এই ঘটনাটিকে একটি সাজানো নাটক মনে করা অনেকের কাছেই হলিউডের সিনেমার মতো বা বাস্তব কোনো টিভি শো-এর মতো মনে হচ্ছে। সরকারের পুরো কাঠামোটিই যেন একটি রিয়েলিটি শো-তে রূপ নিয়েছে।
অন্যান্য হামলাচেষ্টা
উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ২০২৪ সালেও দুটি বড় ধরনের হামলাচেষ্টা হয়েছিল। এর একটি ঘটেছিল পেনসিলভানিয়ার বাটলারের নির্বাচনী সমাবেশে এবং অন্যটি হয়েছিল ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে অবস্থিত ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ ক্লাবে। ট্রাম্পের ওপর হওয়া এই তিনটি হামলার কোনোটিতেই প্রশাসন বা সরকার জড়িত ছিল এমন কোনো প্রমাণ আজ পর্যন্ত মেলেনি। তা সত্ত্বেও আমেরিকার একটি বড় অংশের মানুষ মনে করে, প্রতিটি ব্যবস্থাপনাই ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পেনসিলভানিয়ার বাটলারের সমাবেশের হামলাটি সাজানো ছিল বলে মনে করেন ২৪ শতাংশ আমেরিকান। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৪২ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের মাত্র ৭ শতাংশ এই তত্ত্বে বিশ্বাসী। অন্যদিকে, গলফ ক্লাবের হামলাটির ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ও ৭ শতাংশ রিপাবলিকানসহ মোট ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা ঘটনাটিকে সাজানো বলে মনে করেন।
সামগ্রিকভাবে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ২১ শতাংশ বিশ্বাস করেন যে এই তিনটি ঘটনাই আগে থেকে তৈরি করা নাটক ছিল, যেখানে স্বতন্ত্রদের মধ্যে এই হার ১১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে মাত্র ৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে এই সংশয় ছড়ানোর বিষয়টি একেবারেই অপ্রত্যাশিত নয়। জোয়ান ডনোভান জানান, বামপন্থী ও উদারপন্থীদের মাঝে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতি ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বেশ বাড়ছে, কারণ আমেরিকার সব ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তাদের মনে গভীর অনাস্থা রয়েছে। যখন সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সত্য গোপন করে বা নিয়মকানুনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকরা ব্যবস্থার ওপর ভরসা হারিয়ে একধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আশ্রয় নিয়ে নিজেদের সান্ত্বনা দেয়।
অনলাইন চরমপন্থা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ওপেন মেজারসের জ্যেষ্ঠ গবেষক জ্যারেড হোল্ট মনে করেন, এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে আমেরিকানদের মনে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কতটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, এই জরিপের সংখ্যাগুলো অত্যন্ত হতাশাজনক। ষড়যন্ত্রের মানসিকতা এখন মার্কিন রাজনীতি ও সমাজে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে, যেকোনো জটিল ঘটনার পরেই সন্দেহ করাটা মানুষের একধরনের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হচ্ছে।



