তুরস্ক ও ভারতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ করার লক্ষ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। গত এক বছরে পাকিস্তান ইস্যু এবং কাশ্মীর সীমান্তে সংঘাতকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ১২তম রাউন্ড শেষ করেছে দিল্লি ও আঙ্কারা। উভয় দেশই এখন বিশ্বাস করছে যে, বিবাদের চেয়ে সংলাপই শ্রেয়।
সম্পর্কের ওঠানামা
গত বছর আঙ্কারাভিত্তিক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক যখন প্রথমবারের মতো ভারত-তুরস্ক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল, তখন পরিবেশ ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। দুই দেশের কর্মকর্তারা ইতিহাসের দোহাই দিয়ে দুই ভাষার সাধারণ কিছু শব্দ, যেমন ‘হাওয়া’ ও ‘কিসমত’-এর উদাহরণ টেনে সম্পর্কের নতুন শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বসন্ত দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
গত বছরের এপ্রিলে কাশ্মীরে এক ভয়াবহ হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর বিপরীতে তুরস্ক সরাসরি পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ালে দিল্লির সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্কে ফাটল ধরে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তুরস্ককে ‘শত্রু’ হিসেবে চিত্রায়িত করতে শুরু করে এবং অভিযোগ তোলে যে, তুরস্ক ইসলামাবাদকে সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ পাঠাচ্ছে।
যদিও তুরস্কের কর্মকর্তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। এক তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রুটিনমাফিক জাহাজ আসা বা কার্গো ফ্লাইটকে নতুন সামরিক সহায়তা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। তুরস্ক তখন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিল।
অর্থনৈতিক প্রভাব
রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে ভারতে তুরস্কের বাণিজ্যিক স্বার্থ বড় ধরনের আঘাত আসে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতের ৯টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম চালানো তুর্কি কোম্পানি সেলেবি এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস-এর সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করে দিল্লি। এয়ার ইন্ডিয়াও তাদের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তার্কিশ টেকনিক-এর ওপর নির্ভরতা কমানোর ঘোষণা দেয়।
এর প্রভাব পড়ে পর্যটন ও বাণিজ্যেও। তুর্কি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে তুরস্কে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজার থেকে কমে ২ লাখ ৫০ হাজারে নেমে আসে। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৬.৭ শতাংশ কমে ৭.৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
কৌশলগত বাধ্যবাধকতা
সম্পর্ক মেরামতের পেছনে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে ভারত বিকল্প পথের সন্ধানে মরিয়া।
২০২৩ সালে ভারত ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর-এর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যে ইয়েমেন ইস্যু নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল-সৌদি স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় এই প্রজেক্ট এখন অনিশ্চিত।
অন্যদিকে, তুরস্ক ‘মিডল করিডোর’-এর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা আজারবাইজান ও জর্জিয়া হয়ে এশিয়াকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করে। ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখন একটি মাত্র করিডোরের ওপর নির্ভর করতে চান না এবং তুরস্কের এই প্রকল্পে যুক্ত হতে আগ্রহী।
কাশ্মীর ইস্যু প্রধান অন্তরায়
সম্পর্ক উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে রয়ে গেছে কাশ্মীর ইস্যু। তুরস্ক ঐতিহাসিকভাবেই এই বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করে এবং গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান কাশ্মীর নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি, যাকে ভারতের প্রতি বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়েছিল। যদিও পরবর্তী সংকটের পর তিনি আবারও বিষয়টি তার ভাষণে ফিরিয়ে আনেন।
ভারতের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভুল বোঝাবুঝি জিইয়ে রাখার চেয়ে সংলাপ অনেক ভালো।
গত বছর তুরস্ক ভারতের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বা ভারতীয় এমপিদের উস্কানিমূলক মন্তব্যের বিপরীতে কোনও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আঙ্কারার এই ধৈর্যই মূলত আলোচনার পথ প্রশস্ত করেছে।
উভয় পক্ষই এখন উচ্চপর্যায়ের সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভারতের দাবি, তুরস্ক যদি কাশ্মীর ইস্যুতে তাদের জনসমক্ষে দেওয়া অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা আনে এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে, তবে এই সম্পর্ক আরও সুসংহত হবে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই



