তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছেন দক্ষিণী সুপারস্টার থালাপতি বিজয়। তার দল ১০৮টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার ১১৮ থেকে তিনি এখনও ১০টি আসন দূরে। এই অবস্থায় বিজয় নিজেরসহ ১০৭ জন বিধায়কের স্বাক্ষর নিয়ে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকারের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং মৌখিকভাবে পাঁচজন কংগ্রেস বিধায়কের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু টানা দুই দিন অপেক্ষার পরও ভাগ্য সহায় হয়নি তার। রাজ্যপাল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিজয়কে ১১৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষর নিয়েই ফিরতে হবে।
বর্তমান ডিএমকে সরকারের মেয়াদের আর মাত্র তিন দিন বাকি। এমন সময়ে সরকার গঠন নিয়ে এই অচলাবস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজ্যপালের ক্ষমতা ও স্বেচ্ছাধীন এখতিয়ার নিয়ে এক বিশাল সাংবিধানিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, রাজ্যপাল কি একক বৃহত্তম দলকে সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানাতে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য, নাকি আমন্ত্রণের আগে সংখ্যাগরিষ্ঠতা যাচাইয়ে তিনি নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করতে পারেন?
ভারতের শীর্ষস্থানীয় সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। বিধানসভার ফ্লোর টেস্ট বা আস্থা ভোটই যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের চূড়ান্ত পথ, সে বিষয়ে সবাই একমত হলেও তার আগের পর্যায়ে রাজ্যপালের ক্ষমতা কতটুকু, তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।
মুকুল রোহাতগি: ‘রাজ্যপাল বাধ্য’
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহাতগি মনে করেন, রাজ্যপাল সাংবিধানিকভাবে একক বৃহত্তম দলকে প্রথমে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য। রাজ্যপালের বর্তমান অবস্থানকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, রাজ্যপালের কর্তব্য হলো একক বৃহত্তম দলকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের ফ্লোর টেস্টের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগ করে দেওয়া। রোহাতগি যুক্তি দেন, শপথ নেওয়ার আগেই ১১৮ জন বিধায়কের সমর্থনের প্রমাণ দেওয়ার জন্য রাজ্যপাল জোর করতে পারেন না।
রোহাতগির মতে, এই পর্যায়ে রাজ্যপালের ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত। তিনি বড়জোর বিধায়কদের স্বাক্ষরগুলো সঠিক কি না তা যাচাই করতে পারেন। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, ভারতে অতীতে অনেক সংখ্যালঘু সরকার গঠনের নজির রয়েছে, যেখানে সরকার গঠনের আমন্ত্রণের আগে পূর্ব-যাচাইকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাধ্যতামূলক ছিল না।
নীরজ কিষাণ কাউল: ‘সংবিধানের অস্পষ্টতা ও বিচারিক পর্যবেক্ষণ’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নীরজ কিষাণ কাউল বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, সংবিধানের ১৬৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজ্যপালকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একক বৃহত্তম দল নাকি নির্বাচন-পরবর্তী কোনও জোটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সংবিধানে কোনও কঠোর নিয়ম নেই।
তবে কাউল একমত যে, আমন্ত্রণের আগে ১১৮ বিধায়কের সমর্থনের প্রমাণের দাবিতে রাজ্যপাল অনড় থাকতে পারেন না। তিনি ১৯৯৪ সালের ঐতিহাসিক এস আর বোম্মাই বনাম ভারত ইউনিয়ন মামলার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজভবনে নয় বরং জনসমক্ষে বিধানসভার ভেতরেই প্রমাণিত হতে হবে।
কাউল আরও জানান, বোম্মাই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ইচ্ছাকৃতভাবে আমন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। তিনি ১৯৮৮ সালের সরকারিয়া কমিশন এবং ২০১০ সালের পুঞ্চি কমিশনের সুপারিশের কথা উল্লেখ করেন। সরকারিয়া কমিশন বলেছিল, প্রথমে প্রাক-নির্বাচন জোট, এরপর একক বৃহত্তম দল এবং সবশেষে নির্বাচন-পরবর্তী জোটকে সুযোগ দেওয়া উচিত। অন্যদিকে, পুঞ্চি কমিশন বলেছিল যে দল বা জোটের ‘সর্বাধিক সমর্থন’ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, রাজ্যপাল তাদেরই ডাকতে পারেন।
গোয়া ও কর্ণাটকের উদাহরণ টেনে কাউল বলেন, আদালত সাধারণত রাজ্যপালের এই স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করে না, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্রুত বিধানসভায় যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিষেক মনু সিংভি: ‘গণতান্ত্রিক প্রথার অবমাননা’
কংগ্রেস সাংসদ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি রাজ্যপালের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে, সাংবিধানিক নৈতিকতা এবং প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রথা অনুযায়ী অন্য কোনও জোট দাবি না করলে একক বৃহত্তম দলকেই ডাকা উচিত।
সিংভি বলেন, মাত্র সাত বা আটটি আসনের ব্যবধান খুব বড় কোনও বিষয় নয় এবং ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে আস্থা ভোটের মাধ্যমে এটি নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক প্রথা থেকে বিচ্যুতি গণতান্ত্রিক আদর্শ ও ফেডারেল নীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে



