গতকাল শনিবার ফ্লোরিডার পাম বিচ বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের দেওয়া একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব তিনি খতিয়ে দেখছেন। তবে এ প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, তেহরান এখনো তাদের কৃতকর্মের জন্য ‘যথেষ্ট মূল্য দেয়নি’।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দেশটির সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ ও ফারস জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। তেহরানের এ প্রস্তাবে ইরান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার ও ইরানের জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
গতকাল ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ ওঠার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে পরে জানাব। তারা (ইরান) আমাকে প্রস্তাবের হুবহু বয়ান পাঠাচ্ছে।’ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ প্রস্তাব নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমি কল্পনাও করতে পারছি না যে এটি গ্রহণযোগ্য হবে। কারণ, গত ৪৭ বছরে বিশ্ব ও মানবতার যা ক্ষতি তারা করেছে, তার জন্য এখনো বড় কোনো মূল্য দেয়নি।’
উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহেই ইরানের দেওয়া আগের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ট্রাম্প। রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গত এক সপ্তাহে জানিয়েছে, পারমাণবিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আগেই হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তেহরান।
ইরানের প্রস্তাবের বিস্তারিত
ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের ১৪ দফার প্রস্তাবে ইরান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার ও তেহরানের জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ইরানকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। এ প্রস্তাবের আওতায় হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নতুন ব্যবস্থার কথা বলেছে ইরান।
সামরিক হামলার আশঙ্কা
গতকাল ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প আবারও নতুন সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘যদি তারা কোনো অসদাচরণ করে বা খারাপ কিছু করে, তবে কী হবে, তা আমরা দেখব। তবে আবারও সামরিক হামলার আশঙ্কা অবশ্যই আছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। তবে গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। সংকটের স্থায়ী সমাধানে এরই মধ্যে পাকিস্তানে একবার শান্তি আলোচনা হলেও তা ব্যর্থ হয়।
ইরানের অবস্থান
বর্তমান অচলাবস্থা প্রসঙ্গে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজিম গরিবাবাদি তেহরানে কূটনীতিকদের বলেন, ‘বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে, অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এখন দেশটির। তারা কি কূটনীতির পথে হাঁটবে, নাকি সংঘাত চালিয়ে যাবে—ইরান দুই পথের জন্যই প্রস্তুত।’ ওয়াশিংটনও বারবার স্পষ্ট করেছে যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের চুক্তি ছাড়া তারা যুদ্ধ থামাবে না।
গত ফেব্রুয়ারিতে পারমাণবিক আলোচনা চলাকালেই ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে, এমন অভিযোগ তুলে হামলা শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। যদিও ইরান বরাবরই তাদের এ কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে।
হরমুজ প্রণালি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের বিনিময়ে ইরানকে অর্থ না দিতে জাহাজ কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যারা এ নিয়ম ভাঙবে, তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
ইরানের তেলের আয় বন্ধ করে দেশটির অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে তাদের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যুদ্ধ–পূর্ব সময়ের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র এক সতর্কবার্তায় জানায়, ইরানকে শুধু নগদ অর্থই নয়, কোনো ধরনের ডিজিটাল সম্পদ, পণ্য বিনিময় কিংবা ইরানি দূতাবাসে দান হিসেবেও কোনো অর্থ দেওয়া যাবে না।



