পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে উত্তেজনা চরমে, দুই দলেরই শঙ্কা
পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে উত্তেজনা চরমে

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিধানসভার দ্বিতীয় দফার ভোটের দুই দিন আগে উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়ছে। দ্বিতীয় দফার নির্বাচন আগামী বুধবার, ২৯ এপ্রিল। দুই প্রধান দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি এবং অন্যান্য দল, বিশেষ করে সিপিআই (এম), কংগ্রেসসহ ছোট ছোট দল ও নির্দলীয় প্রার্থীরা প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সবাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলেছেন একই কথা, অর্থাৎ তাঁদের ভোট দেওয়া কেন জরুরি। যাঁরা নিজেদের জন্য ভোট চাননি, তাঁরাও অন্তত এটা বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে কোনো নির্দিষ্ট দলকে ভোট দেওয়াটা কেন অনুচিত হবে।

এ পরিস্থিতিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই প্রধান দলের নেতা ও পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে যা বেরিয়ে আসছে, তা কিন্তু বেশ চিত্তাকর্ষক।

প্রথম দফায় বিজেপির লক্ষ্য পূরণ হয়নি

দুই দলের ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষকদের মোটামুটি বক্তব্য হচ্ছে, প্রথম দফার নির্বাচনে ১৫২ আসনের মধ্যে অন্তত ১০০টি আসন পাওয়ার যে লক্ষ্য বিজেপি নির্ধারণ করেছিল, তা পূর্ণ হচ্ছে না। বিজেপির উত্তরবঙ্গের এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম দফা নির্বাচনে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা পূর্ণ হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কী হবে, তা বোঝা যাবে আগামী ৪ মে ফলাফল বেরোনোর পর। বিজেপির এই প্রবীণ নেতা আর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম দফায় উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে ১৫২ আসনে ভোট হয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই অংশে বিজেপি পেয়েছিল ৫৯টি (৩৮ শতাংশ) আসন। তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৯০টি (৫৯ শতাংশ) আসন। বিজেপির লক্ষ্য ছিল, গতবারের ৫৯ আসনকে ১০০ থেকে ১১০ আসনে নিয়ে যাওয়া। এই লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না বলে মনে করছেন তৃণমূল ও বিজেপি দুই দলেরই নেতা–কর্মীরা।

তবে এটা স্পষ্ট নয়, প্রত্যাশিত আসনের ঠিক কতটা পেছনে থাকছে বিজেপি। তৃণমূল–ঘনিষ্ঠ এক বাংলা জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সদস্য মনে করছেন, বিজেপির আসন খারাপ হলে ৬৫ এবং ভালো হলে ৭৫-এর মধ্যে থাকবে। অর্থাৎ খুব ভালো হলেও বিজেপির আসন ১০০–এর ধারেকাছে যাচ্ছে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম দফায় কেন বেশি আসন পাওয়া বিজেপির জন্য জরুরি

প্রথম দফায় যে অঞ্চলে ভোট হয়েছে, সেখানে এমন কয়েকটি জেলা রয়েছে, যেগুলোয় গতবার বিজেপি প্রচুর ভোট পেয়েছিল। যেমন কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং ও দার্জিলিং। এখানে ২৭ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ২১টি আসন। পশ্চিম মেদিনীপুরে ১৬ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ৭টি, পুরুলিয়াতে ৯টির মধ্যে ৬টি, বাঁকুড়ায় ১২টির মধ্যে ৮টি। তবে অন্য ১৩২ আসনের মধ্যে তারা পেয়েছিল ৩২টি আসন। তা সত্ত্বেও এই ১৫২ আসনে বিজেপির ফল ছিল অপেক্ষাকৃত ভালো।

দ্বিতীয় দফায় দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি

দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের যে দক্ষিণ অংশে ভোট হবে, সেই অংশে তৃণমূল কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করে আসছে। গতবার ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ১৪২ আসনের মধ্যে এই অংশে ১২৩ (৮৭ শতাংশ) আসনে জয়ী হয়েছিল। বিজেপি পেয়েছিল ১৮টি (১৩ শতাংশ) আসন। একটি আসন পেয়েছিল মুসলিমপ্রধান দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট।

বিজেপিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন, অর্থাৎ মোট ২৯৪ আসনের অর্ধেকের থেকে একটি বেশি বা ১৪৮ আসন পেতে হলে, তাদের দক্ষিণবঙ্গে প্রচণ্ড ভালো ফল করতে হবে। যদি ধরে নেওয়া হয়, বিজেপি প্রথম দফায় ৭৫টি আসন পাচ্ছে, তাহলে এই পর্যায়ে তাদের পেতে হবে ১৪২-এর মধ্যে ৭৩টি আসন। যেখানে তারা গতবার ১৪২ আসনের মধ্যে ১৪ আসন পেয়েছিল, সেখানে পেতে হবে ৭৩ আসন। শতাংশের হিসাবে ১৩ থেকে একলাফে পৌঁছে যেতে হবে ৫১ শতাংশে। এটা করতে হবে দক্ষিণবঙ্গে, যে অঞ্চলকে তৃণমূলের দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে মনে করা হয়।

এখানকার দুটি বড় জেলা বাংলাদেশ লাগোয়া উত্তর চব্বিশ পরগনা এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় মোট আসন ৬৪। গত নির্বাচনে এই দুই জেলা মিলিয়ে তৃণমূল পেয়েছিল ৫৮টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮ আসনের এক–তৃতীয়াংশ আসন তৃণমূল তুলে নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মাত্র দুটি জেলা থেকে। এখানে তৃণমূলকে বিজেপির বড় রকম ধাক্কা দিতে হবে। এটা একেবারেই সহজ কাজ নয়।

আর সবকিছু ছেড়ে দিলেও ২০১১ সালের জনগণনা মোতাবেক, উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় মুসলিম জনসংখ্যা যথাক্রমে ২৫ ও ৩৫ শতাংশ। এসআইআর হওয়ার আগে আশা করা গিয়েছিল, এই ভোটের কিছুটা মুসলিমপ্রধান দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টে যাবে। তবে উত্তর চব্বিশ পরগনার ঠিকাশ্রমিক সরবরাহকারী জাহিদ শেখ বলছেন, মুসলমান সমাজের ভোট প্রায় পুরোপুরি এখন তৃণমূল কংগ্রেসে যাবে। কারণ, বড় সংখ্যক মুসলিম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ায়, বাকি মুসলিমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের ভোটটা এক জায়গায় পড়বে।

দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলায় তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য

এর বাইরে দ্বিতীয় দফায় দক্ষিণবঙ্গে এমন বেশ কিছু জেলা রয়েছে, যেখানে গতবার সব আসন পেয়েছিল তৃণমূল। যেমন কলকাতায় ১১–র মধ্যে ১১, হাওড়ায় ১৬–তে ১৬ এবং পূর্ব বর্ধমানেও ১৬–তে ১৬। বাকি দুই জেলা নদীয়া ও হুগলির মধ্যে একমাত্র নদীয়ায় বিজেপি ১৭ আসনের মধ্যে ৯টি পেয়ে তৃণমূলকে পেছনে ফেলে দিয়েছিল। হুগলিতে তৃণমূল ১৮টির মধ্যে পেয়েছিল ১৪ আসন। ফলে নদীয়া বাদ দিলে গতবারের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণবঙ্গের সাত জেলায় তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।

অতএব এই অংশে আসনসংখ্যা ১৩ শতাংশ থেকে প্রায় তিন গুণ বাড়িয়ে ৫১ শতাংশে নিয়ে যাওয়া একেবারে খাড়া এক পর্বতে ওঠার মতো বলে স্বীকার করছেন বিজেপির নেতা–কর্মীরাও।

তৃণমূলের ভয়ও ব্যাপক

তৃণমূলের আশঙ্কাও যে ব্যাপক, তা স্বীকার করছেন তাদের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনের নেতারা। বাংলা জাতীয়তাবাদী সংগঠনের ওই নেতা বললেন, বিজেপির ১৪৮ আসন না পেলেও চলবে। তিনি বলেন, বিজেপি যে লক্ষ্য নিয়ে আসলে এগোচ্ছে, সেটা হলো ১২০ আসন, ১৪৮ নয়। বিজেপি ১২০ আসন পেলে স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূল ১৬০ থেকে ১৭০ আসন পাবে। বিরোধী দল বিজেপি হলে ১৬৯ থেকে ১৭০ আসন যথেষ্ট নয়।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে একাধিক রাজ্যে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও বিজেপি সরকার গঠন করেছে। হয় তারা ওই রাজ্যের কোনো দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করেছে, যেমন বিহারে। অথবা দলটাই ভেঙে দিয়েছে, যেমন মহারাষ্ট্রে। এটা তখনই করা সম্ভব, যখন তারা মাত্র ২০ থেকে ২৫টা আসন কম পায়। সে ক্ষেত্রে তারা বিপুল টাকা দিয়ে এমএলএ কিনে নেয় এবং এগিয়ে থাকা দলকে ভেঙে দেয়। মহারাষ্ট্র শিবসেনা যেমন দুই টুকরা হয়ে গেছে। এটা এখন আর খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এই ভয়টাই তৃণমূল পাচ্ছে। সেই কারণেই তারা বারবার বলছে, শুধু জেতাটা যথেষ্ট নয়।

সে ক্ষেত্রে বিজেপি প্রথম দফায় ৭৫ আসনও পেলে দ্বিতীয় দফায় ১২০ আসন পেতে তাদের আর ৪৫ আসন বা ৩১ শতাংশ আসন দরকার হবে, যা শেষ পর্যন্ত হয়তো খুব একটা কঠিন কাজ নয়। এটাই ভয় তৃণমূল কংগ্রেসের। যে কারণে জানপ্রাণ দিয়ে প্রচার চালাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল। প্রচার করছে বিজেপিও। শেষ পর্যায়ে বিজেপির প্রায় গোটা শীর্ষ নেতৃত্বকেই তারা রাজ্যে রেখে দেওয়ার পরিকল্পনাও করেছে।

এরপরও জিতলে তা তৃণমূল কংগ্রেস এবং তাঁর প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য হবে এক ঐতিহাসিক জয়।