তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আজ ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার পাশাপাশি তা বিস্তৃত পরিসরে উন্নীত করতে আগ্রহী তুরস্ক। দৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে বিশেষ করে প্রতিরক্ষাশিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে আঙ্কারা।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সমঝোতা স্মারক
তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে এসে ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে এসব কথা বলেন হাকান ফিদান। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এতে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেওয়া হয়নি। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তৃতা পাঠ করেন। এরপর তাঁরা সংবাদ সম্মেলনস্থল ছেড়ে যান।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে সিউল থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি আজ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর তাঁর সম্মানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যহ্নভোজ শেষে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে দুপুরে কক্সবাজার গেছেন। রাতে তিনি ঢাকায় ফিরবেন। আগামীকাল শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। শনিবার তাঁর ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
আজ দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের পর তুরস্ক ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। এর আওতায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রত্নসম্পদ রক্ষা, জাদুঘর ব্যবস্থাপনা, মহাফেজখানার নথি ও গ্রন্থাগার সামগ্রী সংরক্ষণ, ডিজিটাইজেশন এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত হলো।
সমঝোতা স্মারকের আওতায় উভয় দেশ ইউনেসকোর ১৯৭০ সালের কনভেনশনের আলোকে সাংস্কৃতিক সম্পদের অবৈধ আমদানি, রপ্তানি ও মালিকানা হস্তান্তর প্রতিরোধে যৌথভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস এবং সাংস্কৃতিক সম্পদের তালিকাভুক্তি ও নথিবদ্ধকরণে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে। এ চুক্তি দুই দেশের সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুই ধাপের বৈঠক
গত মার্চে আঙ্কারায় বৈঠকের তিন মাসের মাথায় ঢাকায় বৈঠকে বসলেন খলিলুর রহমান ও হাকান ফিদান। প্রায় এক ঘণ্টার এই বৈঠকে নির্ধারিত কোনো আলোচ্যসূচি ছিল না। আলোচনার শুরুতে প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনায় বসেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর বাংলাদেশ ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একান্তে প্রায় ৩০ মিনিট কথা বলেন।
বৈঠকে নির্ধারিত কোনো আলোচ্যসূচি না থাকলেও দুই দেশের সম্পর্কের নানা বিষয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে এর অর্থ একা চলা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই এই নীতির মূল কথা। বাংলাদেশ বন্ধু ও অংশীদার চায়, কোনো প্রভু নয়।
তিনি জানান, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি ছিল তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুর্কি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি শুধু তাঁদের জন্যই পৃথক এই অঞ্চলের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জাহাজনির্মাণ, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের তুর্কি বিনিয়োগ আসবে।
প্রতিরক্ষাশিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধি
হাকান ফিদান বলেন, 'আমরা বিস্তৃত পরিসরে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার এবং দৃঢ় ভিত্তির ওপর এটিকে আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছি।'
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য উদ্যোগগুলো খুঁজে দেখছেন বলে জানান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। 'বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষাশিল্পে, আমাদের সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি,' বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
বৈঠকে দুই দেশ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়গুলোতে অভিন্ন অবস্থান ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে বলে জানান হাকান ফিদান।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবিক সহযোগিতা
অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও তুরস্কের আধুনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন বা উন্নয়নে তুরস্ককে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।
খলিলুর রহমান জানান, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি তুরস্কে বসবাস করছেন, যাঁদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। সরকারের আশা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়লে দুই দেশের সম্পর্ক আরও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি পাবে।
রোহিঙ্গা সংকটে পাশে থাকার আশ্বাস
রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সংহতি ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'এই সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচ্যসূচিতে রাখার জন্য আমরা নিবিড় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।'
তিনি বলেন, 'রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি, আমরা তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলকভাবে নিজের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের সমর্থনও অব্যাহত রাখব।'
হাকান ফিদান বলেন, 'নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি জোরদার করার লক্ষ্যে আমাদের যৌথ অঙ্গীকারকে সুদৃঢ় করতে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখব।'
বিশ্বশান্তিতে বিশেষ গুরুত্ব
আঞ্চলিক সংঘাতগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বৈশ্বিক গতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং সেগুলো বৃহত্তর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা গভীর উদ্বেগের কারণ।
হাকান ফিদান বলেন, 'ইরানের যুদ্ধ আমাদের অঞ্চলের বাইরেও সমগ্র বিশ্বকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনায় অর্জিত অগ্রগতিকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা আশা করি, এই আলোচনা বাস্তব ফলাফল বয়ে আনবে এবং স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপন করবে।'
আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধ-পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যাবশ্যক বলে উল্লেখ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'বিরোধ কেবল সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান করা যায়—এই উপলব্ধির আলোকে আমরা আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছি।'
হাকান ফিদান বলেন, 'আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গেই নয়, আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গেও পরামর্শ অব্যাহত রাখছি। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী করার জন্য পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে আমরা অত্যন্ত মূল্য দিই এবং সক্রিয়ভাবে সেই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য যৌথ অঙ্গীকার প্রদর্শন করতে হবে।'



