ফিলিপাইনে সিনেটর আশ্রয় নেওয়ার পর পার্লামেন্টে গোলাগুলি
ফিলিপাইনে সিনেটর আশ্রয় নেওয়ার পর পার্লামেন্টে গোলাগুলি

ফিলিপাইনের পার্লামেন্ট ভবনে দেশের একজন শীর্ষ সিনেটর আশ্রয় নেওয়ার পর সেখানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১৩ মে) রাজধানী ম্যানিলায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পার্লামেন্ট ভবনে থাকা মানুষজন আত্মরক্ষার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যান। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ওই সিনেটর নিজের গ্রেপ্তার আসন্ন বলে ঘোষণা দেওয়ার পরপরই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সিনেটর রোনাল্ড দেলা রোসা কে?

পার্লামেন্ট ভবনে আশ্রয় নেওয়া ওই সিনেটরের নাম রোনাল্ড দেলা রোসা। ৬৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিক সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের আমলের রক্তাক্ত ‘মাদকবিরোধী অভিযানের’ প্রধান বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা এবং দেশটির সাবেক পুলিশ প্রধান ছিলেন। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ-ভিত্তিক আদালত গত সোমবার তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা উন্মুক্ত করে। একই ধরনের অভিযোগে ৮১ বছর বয়সী সাবেক প্রেসিডেন্ট দুতার্তেও গত বছর হস্তান্তরের পর বর্তমানে আইসিসিতে বিচারের অপেক্ষায় আছেন। সিনেটর রোনাল্ড দেলা রোসা তার বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ হত্যাকাণ্ডের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সিনেটর ভিডিও বার্তায় কী বলেছেন?

গত সোমবার থেকে আইনসভার সুরক্ষায় থাকা এই সিনেটর নিজের কার্যালয় থেকে ফেসবুকে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ফিলিপাইনের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তিনি আশা করেন দেশের মানুষ তাকে সহযোগিতা করবে এবং আর কোনো ফিলিপিনোকে যেন দ্য হেগে নিয়ে যাওয়া না হয়, সেটি নিশ্চিত করবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গোলাগুলির ঘটনা ও তদন্ত

ঘটনাস্থলে থাকা রয়টার্সের সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন, ছদ্মবেশী সামরিক পোশাকে সজ্জিত অন্তত ১০ জনেরও বেশি সেনা সদস্যকে অ্যাসাল্ট রাইফেলসহ সিনেট ভবনে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ শাখার প্রধান জার্সেস ট্রিনিদাদ রয়টার্সকে জানান, সিনেট কর্তৃপক্ষই তাদের কাছে ভবন সুরক্ষায় সহায়তার আবেদন জানিয়েছিল। অন্যদিকে সিনেট সেক্রেটারি মার্ক ল্যান্ড্রো মেন্ডোজা জানান, জাতীয় তদন্ত ব্যুরোর (এনবিআই) সদস্য বলে ধারণা করা কর্মকর্তারা সিনেটে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন এবং পিছু হটার সময় তারা গুলি চালান। তবে এনবিআই পরিচালক মেলভিন মাতিবাগ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, তাদের কোনো প্রতিনিধি সেখানে পাঠানো হয়নি এবং বিচারমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকায় তাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না।

গোলাগুলির ঘটনার পর পরই ঘটনাস্থলে পৌঁছান অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী জনভিক রেমুলা। তিনি বলেন, তখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী কেউ আহত হননি এবং সিনেটর রোনাল্ড দেলা রোসা সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন। কারা গুলি চালিয়েছে তা নিশ্চিত হতে সিকিউরিটি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, আপাতত কোনো গ্রেপ্তারি অভিযান চালানো হবে না।

দুতাের্তের মাদকবিরোধী অভিযান ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

রোনাল্ড দেলা রোসা, যিনি ফিলিপাইনে 'বাতো' (পাথর) নামেও পরিচিত, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় পুলিশপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যখন দুতার্তের মাদকবিরোধী অভিযানের প্রাথমিক পর্যায় চলছিল। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে মাদক বড় ব্যবসায়ী ছাড়াও সাধারণ ব্যবহারকারী ও ছোট–খাটো মাদক কারবারি ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো পুলিশের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড ও তথ্য গোপনের অভিযোগ আনলেও পুলিশ তা অস্বীকার করে দাবি করেছে, অভিযানে নিহত ৬ হাজারেরও বেশি মানুষ সশস্ত্র ছিলেন এবং তারা গ্রেপ্তারে বাধা দিয়েছিলেন। মানবাধিকার কর্মীদের মতে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা হয়তো কখনই জানা যাবে না।

বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনি লড়াই

আজ দিনভর সিনেট ভবন জুড়ে ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বাইরে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের একাংশ ডেলা রোসার গ্রেপ্তারের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছিলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিনেট প্রেসিডেন্ট অ্যালান পিটার কায়েতানো প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের সঙ্গে কথা বলেন। কায়েতানো জানান, প্রেসিডেন্ট তাকে নিশ্চিত করেছেন যে এই ঘটনার সঙ্গে সরকারি কোনো বাহিনীর সম্পৃক্ততা নেই।

গত নভেম্বরে জনসমক্ষ থেকে আড়ালে চলে যাওয়ার পর গত সোমবারই প্রথম সিনেটে হাজির হন ডেলা রোসা। তিনি ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট মার্কোসের কাছে তাকে আইসিসির হাতে সোপর্দ না করার আবেদন জানিয়েছেন এবং সুপ্রিম কোর্টে একটি জরুরি আবেদন দাখিল করেছেন। সর্বোচ্চ আদালত এক বিবৃতিতে এই আবেদনের প্রেক্ষিতে সব পক্ষকে জবাব দেওয়ার জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে। ডেলা রোসার দাবি, ফিলিপাইন যেহেতু আর রোম সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, তাই তাকে হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ অবৈধ হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে আইসিসির প্রসিকিউটর মাদকবিরোধী অভিযানের প্রাথমিক তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিলে সাবেক প্রেসিডেন্ট দুতার্তে একতরফাভাবে ফিলিপাইনকে আইসিসি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। তবে আইসিসির অবস্থান হলো, কোনো দেশ সদস্য থাকাকালীন সময়ে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার এই আদালতের রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে দুতার্তেই হতে যাচ্ছেন আইসিসিতে বিচারের মুখোমুখি হওয়া প্রথম কোনো এশিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি সবসময় দাবি করে এসেছেন যে দেশের মানুষকে মাদকমুক্ত করতে তিনি জেলে পচতেও প্রস্তুত। দুতার্তের আইনি দল অবশ্য বরাবরের মতোই তার নির্দোষ হওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।