ফিলিস্তিনের অধিকার প্রশ্নে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন মার্কিন ইহুদিরা
মার্কিন ইহুদিদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী জাগরণ

ফিলিস্তিনের অধিকার প্রশ্নে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন মার্কিন ইহুদিরাও। আমেরিকান ইহুদি সম্প্রদায়ের ভেতরে ঐতিহাসিক এক জাগরণ তৈরি হয়েছে। নিজেদের পরিচয়, আনুগত্য এবং ইহুদিদের নিরাপত্তার অজুহাতে গণবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের পক্ষ নেওয়ার বিরুদ্ধে তুমুল পুনর্বিবেচনার জোয়ার চলছে। গাজা কেবল তাঁদের মতামতকেই বিভক্ত করেনি, বরং ইসরায়েলকে সমর্থন করার ঐতিহ্যগত অধিকারের ব্যাপারে তাঁদের মৌলিক ঐক্যকে চুরমার করে দিয়েছে।

জরিপে ফুটে উঠেছে বিবেকের সংকট

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ আমেরিকান ইহুদি মনে করেন ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধাপরাধ করেছে। প্রায় প্রতি দশজনে চারজন, অর্থাৎ ৩৯ শতাংশ আরও এক ধাপ এগিয়ে একে ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন। একই বছর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে এবং ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের এক যৌথ জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩১ শতাংশ আমেরিকান ইহুদি ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেন, যেখানে ৫৮ শতাংশ সরাসরি এর বিরোধিতা করেছেন। তরুণ ইহুদিদের (১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী) মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি আবেগীয় টান একেবারেই ভেঙে পড়েছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে যেখানে এই টান ছিল ৬৮ শতাংশ, তরুণদের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশে।

দলীয় বিভাজন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন

দলীয় বিভাজনও এখানে স্পষ্ট। ইহুদি রিপাবলিকানদের ৮৫ শতাংশ ইসরায়েলের আচরণকে সমর্থন করলেও, ইহুদি ডেমোক্র্যাটদের মাত্র ৩১ শতাংশ এতে একমত। অর্থাৎ দুই দলের মধ্যে ৫৪ শতাংশের এক বিশাল ব্যবধান রয়েছে। গ্যালাপ-এর ২৫ বছরের ট্র্যাকিং অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের প্রতি মার্কিনদের সহমর্মিতা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্রদের মধ্যে সমর্থন ধসের কারণেই মূলত এমনটি হয়েছে। এর ফলে আইপ্যাকে দুই দলের যৌথ ঐকমত্য আর টিকে নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জিউস ভয়েস ফর পিসের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ফিলিস বেনিস বলেন, ‘চাপ এখন এমনভাবে বাড়ছে, যা আমি আগে কখনোই দেখিনি।’ বেনিস একজন আমেরিকান ইহুদি কর্মী এবং ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং প্যালেস্টাইন অ্যান্ড ইসরায়েল’ বইয়ের লেখক। পাঁচ দশক ধরে তিনি এই লড়াইয়ে আছেন। তাঁর এই মূল্যায়ন কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং বাস্তবতা।

জেভিপির উত্থান

বেনিসের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি ‘জিউস ভয়েস ফর পিস’ (জেভিপি)-এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে এই সংগঠনের অগ্রগতি এককথায় অসাধারণ। ১৯৯৬ সালে বার্কলেতে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া জেভিপির বর্তমান চাঁদা দেওয়া সদস্য সংখ্যা ৩২,০০০-এর বেশি এবং সমর্থক নেটওয়ার্ক সাড়ে ৭ লাখের। গাজা সংকটের আগে তাদের বার্ষিক আয় ছিল ৩-৪ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে আর্থিক দিক থেকে এটি এখন একটি বড় লবিং সংস্থায় পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত তাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় সম্মেলনে শত শত কর্মী যোগ দেন। সেখানে রাশিদা তলাইব, নাওমি ক্লেইন এবং লিন্ডা সারসুরের মতো ব্যক্তিত্বরাও উপস্থিত ছিলেন।

সংগঠনটির বার্ষিক প্রতিবেদনে তাদের নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে: ‘আমাদের নামে নয়’ (নট ইন আওয়ার নেম)। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের নামে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

রাজনৈতিক ময়দানে প্রবেশ

জেভিপির মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকান ইহুদি ধর্মের সঙ্গে জায়নবাদের সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তারা একটি বড় সাংগঠনিক মোড় নেয়। কেবল প্রতিবাদী আন্দোলন হিসেবে না থেকে, নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন, কংগ্রেসে লবিং এবং নিজেদের সদস্য শক্তিকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তারা নির্বাচনী ময়দানে প্রবেশ করে। এক পর্যবেক্ষকের মতে, এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিতে এখন আর ইসরায়েলের বিরোধিতা করা কোনো অযোগ্যতা নয়।

নিউইয়র্ক সিটিতে এই চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল। নিউইয়র্কের ইহুদি বাসিন্দা করিন গ্রিনব্ল্যাট ২০২৫ সালে সিএনএনে বলেছেন, ‘ইহুদি রাজনীতিতে এখন এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন এটা খুব স্পষ্ট যে এখানে ফিলিস্তিনপন্থী ইহুদি আছেন, ইসরায়েলপন্থী ইহুদি আছেন এবং এমন ইহুদিও আছেন যাঁদের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সম্পর্কই নেই।’

তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তন

প্রজন্মের এই পরিবর্তন রুখে দেওয়া অসম্ভব। ‘জিউস ভোটার রিসোর্স সেন্টার’-এর এক জরিপ অনুযায়ী, ৩৫ বছরের কম বয়সী নন-অর্থডক্স ইহুদিদের অর্ধেকই এখন একটি দ্বিজাতিক রাষ্ট্র সমর্থন করেন। এক দশক আগেও মূলধারার ইহুদি সমাজে এই অবস্থান অসম্ভব ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হন। ৩৪ বছর বয়সী এই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী উগান্ডান অভিবাসীর সন্তান এবং বিডিএস আন্দোলনের প্রকাশ্য সমর্থক। তিনি বারবার ইসরায়েলের অভিযানকে গণহত্যা বলে আসছেন। প্রগতিশীল ইহুদি সংগঠন জেভিপি অ্যাকশন, বেন্ড দ্য আর্ক এবং জিউস ফর রেশিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক জাস্টিস-এর সক্রিয় সমর্থনে তিনি এই জয় পান।

মার্কিন সামরিক সহায়তা ও প্রতিক্রিয়া

‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’-এর তথ্যমতে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের এক-তৃতীয়াংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা থেকে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, ইসরায়েলের সমর্থনে মার্কিন পরোক্ষ সামরিক অভিযানসহ এই সহায়তার পরিমাণ ২২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ইনস্টিটিউটের সিদ্ধান্ত খুবই স্পষ্ট: কোনো শর্ত বা লিভারেজ ছাড়াই এই অন্ধ সামরিক সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটে টেনে আনছে। এতে আমেরিকার সম্পদ, মর্যাদা ও স্বার্থের বড় ক্ষতি হচ্ছে। স্বয়ং ইহুদি বংশোদ্ভূত মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স প্রথম কোনো দায়িত্বরত সিনেটর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, ‘এই উপসংহার পৌঁছানো ছাড়া উপায় নেই।’

নৈতিক দায়বদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ

গত দুই বছরে আমেরিকান ইহুদিদের মধ্যে এক-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থন দ্বিগুণ হয়ে ১৩ থেকে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমান তরুণ ইহুদিরা বড় হয়েছে ইসরায়েলের একের পর এক ডানপন্থী সরকারের আমলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের উদ্ধারের দৃশ্য দেখেছে। তাদের দাদা-দাদিদের মতো তারা প্রাতিষ্ঠানিক জায়নবাদী দীক্ষা পায়নি।

জে স্ট্রিটের প্রেসিডেন্ট জেরেমি বেন-অমি বলেন, ‘তরুণ আমেরিকান ইহুদিদের ইসরায়েল থেকে এই দূরে সরে যাওয়ার পেছনে সরাসরি দায়ী বিবি নেতানিয়াহুর নীতি। সেই সঙ্গে আমেরিকান ইহুদি এস্টাবলিশমেন্ট যেভাবে ‘ইসরায়েল যা-ই করুক, তাকেই সমর্থন করতে হবে’ এমন আনুগত্য দাবি করে, তা–ও এর জন্য দায়ী।’

গাজা সংকট ইহুদিদের চেতনা ও পরিচয়ের জায়গায় এক স্থায়ী পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আমেরিকান ইহুদিদের এক নতুন প্রজন্ম এই দৃশ্য দেখেছে, সাক্ষ্যগুলো গ্রহণ করেছে এবং চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা সামাজিক বর্জনের ঝুঁকি নিয়েও উচ্চকণ্ঠে ও প্রকাশ্যে বলেছে—ইসরায়েল তাদের নামে এই কাজ করছে না।

এই অস্বীকৃতি কেবল রাজনৈতিক নয়। ইহুদিদের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী, এটি আসলে একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা। এই প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো বিপ্লব আনবে কি না, তা নির্ভর করছে এই প্রতিবাদ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে কি না তার ওপর।