বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়, প্রশ্ন তুললেন স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা
সংসদ অধিবেশনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব আহরণ, ঋণনির্ভরতা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে কম বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সৎ টাকায় একজন সংসদ সদস্যের কি ঢাকায় প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করা সম্ভব?
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা এ কথা বলেন। তবে বক্তব্যের শুরুতে অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য বলেন, অর্থমন্ত্রী নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছেন। এতে চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এরপর প্রস্তাবিত বাজেট কতটা বাস্তবসম্মত, সে প্রশ্ন তুলে একটি গল্প বলেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য, ওনার নাম ধরে নিলাম মফিজ। সেই সদস্যের মাসে বেতন যদি ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা হয়। এর বাইরে তাঁর কোনো গার্মেন্ট ব্যবসা নাই। তাঁর কোনো ইয়াবা ব্যবসা নাই। তাঁর কোনো অস্ত্রের ব্যবসা নাই। তাঁর কোনো অবৈধ ব্যবসা নাই। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন হলো ঢাকা শহরে তিন একর জায়গার ওপরে প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করে সামনে একখানা সুইমিংপুল থাকবে; হরিণ, ম্যাকাও পাখি পুষবেন। কিন্তু তাঁর এই ১ লাখ ৭৬ হাজার সৎ টাকায় কি ঢাকায় তিন একর জায়গায় প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করা সম্ভব? সম্ভব নয়।’
এরপর রুমিন ফারহানা বলেন, ‘ঠিক একইভাবে যখন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট আসে, তখন আমরা বুঝতে পারি এই বাজেটটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপরই ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি।’
স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠান ১০ মাসে ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলতে পারেনি, তাকে এক বছরে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত?’ তাঁর মতে, এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে বাজেটঘাটতি আরও বাড়বে। তখন সরকারকে দেশীয় ব্যাংকিং খাত থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হবে, যা ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দেবে।
প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে রুমিন ফারহানা বলেন, বিনিয়োগে এত বড় স্থবিরতা বাংলাদেশ আগে দেখেনি। জ্বালানিসংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।
স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য বলেন, সরকার নিজেও ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে চায়। কিন্তু বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ঋণের উচ্চ সুদ এবং অর্থায়নসংকট বিনিয়োগের পথে বড় বাধা।
রুমিন ফারহানা বলেন, বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৮তম। এমন বাস্তবতায় নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই সংসদ সদস্যের ভাষ্য, সরকারি হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ হলেও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী তা সোয়া এক কোটির বেশি। বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না। এ কারণেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে অনেক সময় ‘জবলেস গ্রোথ’ বা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বলা হয়।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতার প্রসঙ্গ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। পুনঃতফসিল, অবলোপন এবং আদালতে আটকে থাকা ঋণ যোগ করলে এই অঙ্ক ১১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো সরকারের অতিরিক্ত ঋণের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থায়নের পথ বেছে নেওয়া হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বৈদেশিক ঋণের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১৩৩ বিলিয়ন (১৩ হাজার ৩০০ কোটি) ডলার। ঋণের সুদ পরিশোধেই বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যয় হবে, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও খাদ্য—এই চার খাতে সম্মিলিত বরাদ্দ ৩০ শতাংশেরও কম।
রুমিন ফারহানা বলেন, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ থেকে ঋণ পাওয়া গেলে সুদের হার কম হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে পরিশোধের সুযোগ থাকবে। কিন্তু অন্য উৎস থেকে ঋণ নিলে সুদের হার বেশি ও পরিশোধের চাপও বেশি হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট, কর্মসংস্থানহীনতা এবং প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া—এগুলোকে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেন সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি বা ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
তবে কর ব্যবস্থার সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হলেও মাসে ৩২ হাজার টাকা আয়কারী একজন ব্যক্তি এখন করের আওতায় পড়েন। বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় এই আয়কে মধ্যবিত্তের নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট বলা যায় না।
আয়বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশের মালিক শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষ। আর মোট সম্পদের এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী। তাঁর অভিযোগ, আয়কর আদায়ের চাপ মূলত বেতনভোগী ও ট্র্যাকযোগ্য আয়ের মানুষের ওপর পড়ে। বিপুল সম্পদের মালিক অনেক ব্যক্তি কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যান।
রুমিন ফারহানা বলেন, প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে এখনো পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভর করছে সরকার। বাজেটে মোট কর আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পরোক্ষ কর, যা ধনী-গরিব সবার ওপর সমানভাবে চাপ সৃষ্টি করে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে রুমিন ফারহানা বলেন, শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশের কাছাকাছি এবং স্বাস্থ্য খাতে আরও কম। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) অন্তত ৫ শতাংশ এবং ইউনেসকো শিক্ষা খাতে ৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করে।
এই সংসদ সদস্য বলেন, স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত সরকারি ব্যয় না থাকায় মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই ব্যক্তিকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। এর ফলে প্রতিবছর লাখো মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে।
শিক্ষা প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার আগে শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজির মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘ম্যান্ডারিন বা জার্মান শেখানোর আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে একজন শিক্ষার্থী যেন শুদ্ধভাবে বাংলা, ইংরেজিতে লিখতে ও বলতে পারে।’



