ঢাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতা: তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরাও সক্রিয়
ঢাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতা: তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরাও সক্রিয়

রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, ব্যস্ত সড়ক কিংবা বাসার সামনে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশও। ঘটনার পর মাঠপর্যায়ে কিছু আসামি গ্রেপ্তার হলেও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেশাদার এসব সন্ত্রাসী চক্রের নিয়ন্ত্রক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না পুলিশ। ফলে অপরাধ থামছে না, বরং নতুন নতুন ঘটনা ঘটেই চলেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

২১ মাসে ৫৯৭ খুন, ৭৭৩ ডাকাতি-ছিনতাই

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ২১ মাসে ঢাকা মহানগরে খুনের মামলা হয়েছে ৫৯৭টি। এর মধ্যে ১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’।

একই সময়ে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ৭৭৩টি। যদিও ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা অনেক বেশি বলে পুলিশ কর্মকর্তারাই মনে করেন। কারণ, অধিকাংশ ঘটনাতেই ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না। কেউ কেউ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা না নেওয়ার অভিযোগও আছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচিত ১০ ছিনতাইয়ের একটিরও তদন্ত শেষ হয়নি

ঢাকায় আলোচিত ১০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর একটিরও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। এর মধ্যে অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে যুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও কম নয়। গত ২১ মাসে কেবল ঢাকাতেই পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৪২টি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচিত না হলে ব্যবস্থা নেই

রাজধানীতে ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের ঘটনা বাড়লেও অপরাধী চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে খুব একটা অচেনা নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) করা সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীতে ১১৭টি পেশাদার অপরাধী দল সক্রিয় রয়েছে। এসব দলের সদস্যসংখ্যা ১০ থেকে ২০ জনের মধ্যে। ভাড়াটে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত এসব চক্রের সদস্যদের নাম-পরিচয় পুলিশের এই তালিকায় রয়েছে। এসব অপরাধী দলগুলোকে কারা পৃষ্ঠপোষকতা দেন, তাঁদের নামও রয়েছে। ঢাকায় আলোচিত খুন-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে এসব দলের সম্পৃক্ততাও পাচ্ছে পুলিশ।

সর্বশেষ ১৬ জুন আদাবরে এক বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে। ঘটনাটি আলোচনায় আসার পর ছিনতাইকারী ধরতে মাঠে নামে পুলিশ। ওই দিনই অভিযানে গিয়ে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলামসহ দুজন ছিনতাইকারীদের হামলার মুখে পড়েন। ছিনতাইকারীরা তাঁদের কুপিয়ে আহত করে। এ সময় পুলিশের গুলিতে দুজন আহত হন। পরে জানা গেল, হামলাকারীরা ডিএমপির তালিকায় থাকা মোহাম্মদপুর-আদাবরকেন্দ্রিক ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ গ্রুপের সদস্য। ডিএমপির তালিকাতেও এই দলের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় হয় না। ফলে পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী চক্রগুলো একের পর এক ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে।

পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধীরাও সক্রিয়

পুলিশের কাছে অপরাধীদের তথ্য থাকার পরও কীভাবে তারা সক্রিয় থাকে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে মোহাম্মদপুরের আলোচিত আরও একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায়। গত ৩১ মে ভোরে ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পর নূরজাহান রোডের বাসার ফটকে মা-মেয়েকে চাপাতির মুখে জিম্মি করে মালামাল ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ ও র‍্যাব সক্রিয় হয় এবং দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে।

জানা গেছে, এই পেশাদার অপরাধীদের নামও পুলিশের তালিকায় রয়েছে। পরে পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, একই চক্র গত মাসেই মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত ১০টি ছিনতাই করেছিল। কিন্তু ওই সব ঘটনা আলোচনায় আসেনি, মামলাও হয়নি, তদন্তও হয়নি।

এ বিষয়ে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, “অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। ফলে এসব ঘটনার তদন্তও শুরু করা যায় না।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্বেগ

অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত মোহাম্মদপুর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও। গতকাল শনিবার সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বহু বছর ধরে মোহাম্মদপুর অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে আছে। এলাকাটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে অপরাধী চক্রগুলোকে নির্মূল করা হবে।”

৭ জুন মতিঝিলের ব্যস্ততম এলাকা শাপলা চত্বরের জনতা ব্যাংকের সামনে দিনদুপুরে এক মানি এক্সচেঞ্জ (মুদ্রা বিনিময়) ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার ডাকাতির ঘটনা ঘটে। চার মোটরসাইকেলে আসা আট ডাকাতের মধ্যে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে একজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। ওই ব্যক্তি এর আগে আরও চারটি ডাকাতির মামলার আসামি ছিলেন এবং পুলিশের তালিকায় তাঁর নাম ছিল। সেখান থেকে নাম-ঠিকানা নিয়ে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশি ব্যবস্থায় ধাক্কা

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পুলিশি ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খায়। পরে ধীরে ধীরে পুলিশ সক্রিয় হলেও বাহিনীকে পুরোপুরি পুনর্গঠন ও সক্ষম করে তোলার কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পরও পুলিশ পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বলে অপরাধ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

যদিও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এস এন নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবস্থা ছিল, সেখান থেকে উন্নতি হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশিচৌকি, ব্লক রেড এবং তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি সামাল দিতে গিয়ে পুলিশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।” তিনি বলেন, “একটি ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নতুন ঘটনা ঘটছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। তা সত্ত্বেও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”

অপরাধজগতের দ্বন্দ্বে খুনোখুনি

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে রাজধানীর অপরাধজগৎ অস্থির হয়ে ওঠে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় ১১টি হত্যার ঘটনা ঘটে।

এই ১১টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৮টির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বাকিগুলো থানা-পুলিশ তদন্ত করছে। ডিবির কর্মকর্তাদের দাবি, তারা সাতটি হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে এবং শুটার বা ঘটনায় জড়িত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারও করেছে।

তবে কোনো মামলার তদন্ত এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা যায়নি। ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ছয়টি হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা মাঠপর্যায়ে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করলেও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে আদালতে উপস্থাপনের মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। ফলে মূল নির্দেশদাতারা আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ খুন

সর্বশেষ ঢাকার রামপুরায় খুন হন পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইয়াছিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ। ১২ জুন বেলা পৌনে ২টার দিকে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের উল্টো দিকে নিজের বাসার কাছে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। এক সপ্তাহ পর, গত শুক্রবার এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা যান তিনি। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর এক মাস আগে তিনি জামিনে মুক্ত হয়েছিলেন।

এই খুনে সন্দেহভাজন হিসেবে বিদেশে পলাতক থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ ওরফে মন্টির নাম এসেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়নি।

এর আগে গত ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক আলোচিত সন্ত্রাসী নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে। দেড় মাস পার হলেও এ খুনে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

মামলাটির তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, “তদন্তে খুব বেশি অগ্রগতি নেই। কাউকে গ্রেপ্তারের আগে বিস্তারিত কিছুই বলা সম্ভব নয়।”

তদন্তের অগ্রগতি নেই

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টিটন হত্যার পর সন্দেহভাজন হিসেবে দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালের নাম এসেছে। এর আগেও একাধিক হত্যা এবং চাঁদাবাজির ঘটনায় এই দুজনের নাম আলোচিত হলেও পুলিশ কাউকেই আইনের আওতায় আনতে পারেনি।

ঢাকার আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি হচ্ছে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়া হত্যা। গত বছরের ১৭ নভেম্বর মুখোশধারী তিন সন্ত্রাসী মিরপুরে একটি দোকানে ঢুকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কিবরিয়া হত্যার ঘটনায় মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান ওরফে মামুনের নাম এসেছে। তবে তদন্তকারী সংস্থা ডিবির সূত্র বলছে, তদন্তে হত্যার নির্দেশদাতা পর্যন্ত পৌঁছানো যায়নি বলে মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।

কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, “তদন্তে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের অনেককেই ডিবি এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এমনকি নির্দেশদাতার নাম এলেও ডিবি নির্দেশদাতার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। এই মামলার সঠিক তদন্ত হবে কি না, তিনি ন্যায়বিচার পাবেন কি না, সেটি নিয়ে সন্দেহ আছে।”

তবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, “আলোচিত প্রায় সব হত্যা মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে কয়েকটি মামলার প্রতিবেদন ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় আটকে আছে। কারিগরি প্রমাণ নিশ্চিত করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। অচিরেই অন্তত দুটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হবে।”

সাফল্য প্রচারে সক্রিয়, তদন্তে নয়

২০২৫ সালের ২৭ মে মিরপুর ১০ নম্বরে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে ২২ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তদন্তে নেমে ওই বছরের ১৭ জুন এই চক্রের প্রধান জলিল মণ্ডলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ডিবির তদন্তে উঠে আসে এই চক্র এর আগে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি কামরাঙ্গীরচর এলাকায় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি করে ৫০ ভরি সোনা এবং ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে গুলি করে ৫২ লাখ টাকা ছিনতাই করেছে। পরে কামরাঙ্গীরচর ও ধানমন্ডির মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সব কটি মামলা তদন্ত করছে ডিবি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এরই মধ্যে এই চক্রের প্রধান জলিল মণ্ডলসহ অধিকাংশ আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছেন। তবে তারা মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি।

এই তিন মামলার ভুক্তভোগীর সঙ্গেই কথা হয়েছে প্রথম আলোর। এর মধ্যে মিরপুরে ২২ লাখ টাকা ছিনতাই এবং ধানমন্ডিতে ৫২ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনার ভুক্তভোগী হতাশা প্রকাশ করেছেন। মূল আসামি ধরা পড়লেও তাঁদের টাকা উদ্ধার হয়নি। ধানমন্ডির ঘটনার মামলার বাদী কাইয়ুম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, “অগ্রগতির কোনো খবর তাঁরা জানেন না। আসামি ধরা পড়লেও কোনো মালামাল ফেরত পাননি।”

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, “এসব মামলার তদন্তে অগ্রগতি আছে। কোনো কোনো মামলায় সব আসামি ধরা পড়েনি। যেমন কামরাঙ্গীরচরে ৫০ ভরি সোনা ছিনতাইয়ের মামলায় আরেকজন আসামি ধরা পড়লে আরও কিছু সোনা উদ্ধার হতে পারে। এ জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে অনেক ছিনতাইয়ের মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।”

গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, “কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে বা গণমাধ্যমে আলোচিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত আসামি ধরার জন্য চাপ দেন। আলোচিত ঘটনায় আসামি ধরা পড়লে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সাফল্যের কথা প্রচার করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই মামলার তদন্তে অগ্রগতি হলো কি না, সেটি খুব বেশি তদারকি করা হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত কার্যক্রম আর এগোয় না। তা ছাড়া ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। দায়িত্ব নিয়ে ঘটনা তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ওপর।”

ডিএমপির ডিসি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, “ফুটেজ দেখে বা প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে মাঠের অপরাধী শনাক্ত করলেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বিভিন্ন এলাকার পেশাদার অপরাধীদের ‘গডফাদারদের’ আইনের আওতায় আনতে হয়। কিন্তু তদন্তে সেভাবে গডফাদারদের নাম আসছে না। এ কারণে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন এবং বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই বন্ধ করা যাচ্ছে না। এমনও দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পর জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধ করছে।”

কঠোর তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুলিশের মধ্যে এখন তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে আলোচনায় না এলে বড় ধরনের চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ঘটনাগুলোর তদন্তে অগ্রগতি কম।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (সাবেক আইজিপি) আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, “এখন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের জবাবদিহি, আন্তরিকতা এবং তদারকির ঘাটতি রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় হতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের শক্ত নির্দেশনা ও জবাবদিহির আওতায় না আনলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।”

সাবেক এই আইজিপির মতে, “প্রথাগতভাবেই খুন, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটলে পুলিশ দ্রুততম সময়ে সক্রিয় হয়। কিন্তু এখন এ ধরনের সব ঘটনায় সে রকম সক্রিয়তা দেখা যায় না।”