ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ফের সক্রিয় অপরাধচক্র, উদ্বেগ বাড়ছে
ঈদুল আজহায় পশুর হাটে চাঁদাবাজি-দখল: অপরাধচক্র সক্রিয়

মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই ঈদুল আজহা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসতে যাচ্ছে কোরবানির পশুর হাট। এই হাটকে কেন্দ্র করেই অন্যান্য বছরের মতো এবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে চাঁদাবাজি, দখল ও নিয়ন্ত্রণের পুরোনো অপরাধচক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, পশুর হাট এখন শুধু মৌসুমি কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি কোটি কোটি টাকার নগদ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র। যেখানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ফের সংঘাতে জড়াচ্ছে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিভিন্ন গ্রুপ।

টিটন হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতার লড়াই

সম্প্রতি রাজধানীতে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন হত্যাকাণ্ড নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে পুরোনো অপরাধ জগতের ক্ষমতার লড়াইকে। গত ২৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসসংলগ্ন বটতলায় গুলি করে হত্যা করা হয় টিটনকে। ঘটনাস্থল ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হামলাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং পেশাদার কায়দায় পরিচালিত।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি ঘটনাস্থলে আসে। একজন কাছ থেকে গুলি চালায়, অন্যজন সহযোগিতা করে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলাকারীদের মুখে মাস্ক ছিল। শ্যুটারের মাথায় ক্যাপ ও পরনে সাদা শার্ট ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তদন্তকারীদের ধারণা, টিটনকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওই এলাকায় ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এখন পর্যন্ত হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পশুর হাট ইজারা দ্বন্দ্ব ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ

টিটনের পরিবার দাবি করছে, মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপনের অভিযোগ, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতে এবং আসন্ন কোরবানির ঈদের আগে আসন্ন পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিটনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তার দাবি, মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস আগে থেকেই টিটন সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার কথা পরিবারকে জানিয়েছিলেন।

তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন পিচ্চি হেলাল। এক অডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, টিটন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে এ ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

নব্বইয়ের দশকের আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে বর্তমান বাস্তবতা

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন টিটন। ধীরে ধীরে হত্যা, অস্ত্র ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন তিনি। ২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় তার নাম ছিল দ্বিতীয় স্থানে।

পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ২০০৪ সালে টিটনকে গ্রেফতার করা হয়। ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা মামলায় ২০১৪ সালে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দীর্ঘ কারাবাসের কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় বিদেশে পালানোর পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে পারেননি টিটন।

জামিনে মুক্তির পর ফের সংঘাত

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কারাগারে থাকা কয়েকজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পান। তাদের মধ্যে ছিলেন, ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসু এবং তারিক সাঈদ মামুন।

গোয়েন্দারা জানান, মুক্তির পর তাদের নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত নভেম্বরে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় তারিক সাঈদ মামুনকে।

কোরবানির হাট ও কোটি টাকার বাণিজ্য

দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর পশুর হাটগুলো শুধু মৌসুমি ব্যবসা নয়, এগুলো নিয়ন্ত্রণ মানে চাঁদাবাজি, পরিবহন, নিরাপত্তা, দোকান বরাদ্দসহ বিশাল আর্থিক সেক্টরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এ কারণে ঈদকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো। মোহাম্মদপুরের বছিলা হাট নিয়েও সম্প্রতি টিটন ও পিচ্চি হেলালের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

গোয়েন্দাদের মতে, এক সন্ত্রাসীর অনুসারীদের হাতে আরেক সন্ত্রাসীর নিহত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং আড়ালে থাকা নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। যে কারণে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পশুর হাটের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে তাই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নগরবাসীর মধ্যে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে টিটন হত্যার তদন্ত চলছে। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। জামিনে থাকা কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

মহানগর পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, কোরবানির পশুর হাট ঘিরে প্রতিটি থানাকে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, প্রচলিত অর্থে শীর্ষ সন্ত্রাসী খুব বেশি নাই। তবে কেউ যদি নাম ভাঙিয়ে বা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, তাদের দমন করা হবে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, টার্গেট কিলিং আগাম শনাক্ত করা কঠিন হলেও হত্যাসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ ও গোয়েন্দা ইউনিট সক্রিয় রয়েছে। পশুর হাট কেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে।