জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধান আইনে আনা হবে। সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের বক্তব্যের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংসদে হেলেন জেরিন খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট নেটওয়ার্ক ও এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট, নারী ও শিশুদের অনলাইন হয়রানি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টি তোলেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে ভুয়া পরিচয়ে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট ও পেজ পরিচালিত হচ্ছে। সংগঠিত বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিও তৈরি করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পুনঃসংজ্ঞায়ন
এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের প্রধান, তার স্ত্রী ও কন্যাসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিবারকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যেসব কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলো আসলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি না, সেটা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা দরকার।
সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোকে আইনের আওতায় আনা হবে। আজকে (সোমবার) সকালেই এ বিষয়ে আমি একটা আইনি সংস্কার করার জন্য ড্রাফটে হাত দিয়েছি। আমি জানতাম না আজকে এই প্রশ্নটা এখানে আসবে।
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর, অপমানকর ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ নামে আমরা অবহিত করবো। এর কতিপয় বিধান সংশোধন করবো। গুজব, অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধানও আইনে যুক্ত করা হবে।
মেটাকে বাধ্য করার আইনি কাঠামো
পরে হেলেন জেরিন খান সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান, মেটাসহ আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না। জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের আইনে এখনো এমন বিধান নেই, যার মাধ্যমে মেটাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করা যায়। তিনি বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে তারা আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে এমন বিধান করেছে, মেটাকে ২৪ ঘণ্টায় অ্যাকশন নিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু আমাদের বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট সাইবার আইনে সেই বিধানটা নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিটিআরসি বা অন্য কর্তৃপক্ষ মেটাকে অনুরোধ পাঠালেও তারা অনেক সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেয় না। তারা বলে, তোমাদের তো আইনটা ঠিকমত নেই। সুতরাং আইনি কভার না থাকলে সেটা প্রেসার দেওয়া যায় না। তিনি জানান, নতুন সংশোধনে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, সময়সীমাভিত্তিক কনটেন্ট অপসারণ এবং রিপোর্ট করা কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়া কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার বিধান থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা সংস্থা ও বিটিআরসিসহ ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য সংস্থাগুলোকেও এ ধরনের কনটেন্ট অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের ক্ষমতা দেওয়ার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।



