আজ মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা দিন। এই দিনের সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃত। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নিম্ন মজুরি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে বাংলাদেশের শ্রমজীবীদের ভাগ্যবদলের চাকা দীর্ঘদিন ধরে সামনে এগোতে চায় না। পোশাক শিল্পে ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক ১৩ হাজার টাকার কম বেতনে কাজ করছেন, যা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ দিনমজুরের কাজ ও ভালো মজুরির নিশ্চয়তা নেই। এই শ্রেণির মধ্যে রয়েছেন নির্মাণশ্রমিক, জাহাজভাঙা শ্রমিক, গৃহশ্রমিক, মাটিকাটা শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, রিকশা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, জেলে বা মত্স্য শ্রমিক ও কারখানার শ্রমিক। তারা মূলত খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন এবং তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ‘দেশের শ্রমজীবীরা খুব একটা ভালো নেই।’
মে দিবসের ইতিহাস ও তাৎপর্য
আজ দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস পালিত হবে। ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকেরা কাজের সময়সীমা ১২ ঘণ্টার পরিবর্তে আট ঘণ্টা নির্ধারণ, কাজের উন্নত পরিবেশ, মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে ধর্মঘট আহ্বান করেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা সেদিন দাবি আদায়ের জন্য পথে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু বিক্ষোভ দমনে সেদিন বর্বর কায়দা অবলম্বন করা হয়েছিল। পুলিশের গুলিতে জীবন উত্সর্গ করেছিলেন ১১ জন তরতাজা শ্রমিক। তাদের জীবনদানের মধ্য দিয়ে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বে ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবি মেনে নেওয়া হয়। সেই থেকে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসাবে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।
বাংলাদেশে মে দিবস উদযাপন
বাংলাদেশেও প্রতিবছর মে দিবস পালিত হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দিবসটি পালনে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ব্যানার-ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডে সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। শ্রমিকের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় মহান মে দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী
মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস উপলক্ষ্যে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ‘এক গৌরবোজ্জ্বল দিন’ বলে মন্তব্য করে বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস পালিত হচ্ছে জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এ উপলক্ষ্যে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল শ্রমজীবী মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’ ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উত্সর্গের ইতিহাস স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তাদের সেই আত্মত্যাগ শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজও আমাদের প্রেরণা ও শক্তি জোগায়।’ তিনি বলেন, ‘শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের কল্যাণে যুগান্তকারী নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।’
মহান মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমজীবী মানুষই একটি দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি। শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও অর্থনীতি গড়ে ওঠে। তাই শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সরকারের অঙ্গীকার। তিনি বলেন, শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান স্মরণ করে বলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন শ্রমিকের দুটো হাত রাষ্ট্র ও সমাজের সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের চাবিকাঠি।
শ্রমিকদের বাস্তব চিত্র
মুখে হাসি নিয়ে কাজ করলেও তাদের দুঃখের সীমা নেই: শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুখে হাসি নিয়ে কাজ করলেও তাদের দুঃখের সীমা নেই। সমাজ ও সভ্যতার ক্রমাগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠছে একের পর এক দালানকোঠা। এক এক করে ইটের গাঁথুনিতে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। কিন্তু রোদে পুড়ে এই ইট যারা তৈরি করেন তারা এক-জীবন খাটুনি করেও স্বপ্ন দেখতে পারেন না দুই কামরার একটি ইটের ঘরের। এ স্বপ্নটা তাদের অধরাই থেকে যায়। তাদের জীবনটা যেন দুর্বিষহ। একে তো স্বল্প মজুরি, তার ওপর বছরের অর্ধেকটা সময়ই কাজ থাকে না, বাকি সময়টা খুঁজতে হয় অন্য কাজ। তারপরও পেটের জ্বালায় বারবার ফিরে আসেন এই ঘাম ঝরানো শরীর পোড়ানো কাজে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক দশক ধরে আছেন রবিউল ইসলাম। ষাটোর্ধ্ব বয়সেও টিকে থাকার লড়াইয়ে তার সঙ্গী রিকশার প্যাডেল। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে আলাপকালে রবিউল ইসলাম বলেন, রিকশা না চালাইলে খামু কী? আগে দিনে ১২ থেকে ১৪টা ভাড়া টানতাম; এখন ৭টাও পারি না। হাজার টাকার রোজগার ঠেকেছে ৩০০-৪০০তে। আগে দিনে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করলেও এখন তা করতে পারছেন পাঁচ-ছয় ঘণ্টা। রাজধানীর পীরেরবাগের মোম্বাই গলিতে নির্মাণাধীন একটি ভবনের শ্রমিক মো. আব্দুর রহমান বলেন, ‘চারপাশ থেকে যেন আগুনের হলকা গায়ে লাগছে। আধা ঘণ্টা পরপর নিচে নেমে পানি খেয়ে আবার উঠছি। কিন্তু সাইট ইঞ্জিনিয়ার আমাদের এই কষ্টের কথা বুঝতে চান না।’
এদিকে বেশির ভাগ শ্রমিক জানেন না মে দিবস কী? এ দিন গণমাধ্যমে কেন তাদের নিয়ে আলোচনা চলে। রাস্তায় কেন তাদের নিয়ে মিছিল বের হয়। প্রতিদিনের মতো এদিনও তারা নেমে পড়েন প্রতিদিনের মতো কাজে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন।
কর্মজীবী নারীর বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের নারী শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ এখনো কৃষি ও গৃহভিত্তিক কাজে যুক্ত। কৃষি খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৭৪ দশমিক ১ ভাগ আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এই হার ৯৬ দশমিক ৬ ভাগ। তুলনামূলকভাবে শিল্প খাতে মাত্র ৮ দশমিক ৭ ভাগ এবং সেবা খাতে ১৭ দশমিক ২ ভাগ নারী কর্মরত। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের ডেটা অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪৩ দশমিক ৭ ভাগ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৮১ দশমিক ১ ভাগ। এই বৈষম্যমূলক পরিসংখ্যান প্রমাণ করে-যদিও নারীর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ বাড়ছে কিন্তু বাস্তব চিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষত গ্রামীণ ও অশিক্ষিত নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাসম্পন্ন কর্মপরিবেশ গড়ে ওঠেনি।
মে দিবসের কর্মসূচি
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষ্যে আজ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। বিকাল ৩টায় রাজধানীর পল্টনস্থ বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটে সমাবেশ করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের শ্রমজীবী, কর্মজীবী শ্রমিক, মজুর, কর্মচারী, মেহনতি মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছে এবং তাদের মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামের সাথে একাত্মতা ও সংহতি জ্ঞাপন করেছে। মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে দেশ ও বিদেশের সকল শ্রমজীবী মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা, গভীর শ্রদ্ধা ও সংহতি জানিয়েছে জাতীয় পার্টি (জাপা)।



