পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট গ্রহণ বুধবার শেষ হয়েছে। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবার নজর ছিল বুথফেরত জরিপের দিকে। কেরালা ও আসামে ৯ এপ্রিল এবং তামিলনাড়ুতে ২৩ এপ্রিল ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে ভোট শেষ হওয়ার পরপরই এই চার রাজ্যের বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ শুরু হয়। তবে চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে আগামী ৪ মে।
পশ্চিমবঙ্গে বুথফেরত জরিপে এবার মিশ্র ফল
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বেশিরভাগ জরিপে দাবি করা হয়েছে, বিজেপি এগিয়ে রয়েছে এবং তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। আবার কোনও কোনও জরিপে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। কোথাও আবার তৃণমূলকে এগিয়ে রাখা হয়েছে।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল এবং বিজেপির দখলে ছিল ৭৭টি আসন।
ম্যাট্রিজের জরিপ অনুযায়ী, বিজেপি পেতে চলেছে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন। তৃণমূল পাচ্ছে ১২৫ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যদের ঝুলিতে যেতে পারে ছয় থেকে ১০টি আসন। চাণক্য স্ট্র্যাটেজির জরিপ অনুসারে, বিজেপি ১৫০ আসনের বেশি পেতে পারে। তারা পেতে পারে ১৫০ থেকে ১৬০টি আসন। তৃণমূল পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যদের ৬ থেকে ১০টি আসন দেওয়া হয়েছে।
পিপলস পালস-এর জরিপে তৃণমূলকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। তারা পেতে পারে ১১৭ থেকে ১৮৭টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ৯৫ থেকে ১১০টি আসন। অন্যদের মধ্যে কংগ্রেস এক থেকে তিনটি এবং বামেরা শূন্য থেকে একটি আসনে জয় পেতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। পি-মার্কের জরিপে বিজেপিকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের মতে, এ রাজ্যে বিজেপি ১৫০ থেকে ১৭৫টি আসনে জিততে পারে। অন্যদিকে, তৃণমূল পেতে পারে ১১৮ থেকে ১৩৮টি আসন। এই সমীক্ষায় অন্যদের কোনও আসন দেওয়া হয়নি।
২০২১ সালের বুথফেরত জরিপ কতটা সঠিক ছিল?
ভোট শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা পর থেকেই সাধারণত বিভিন্ন সংস্থা তাদের জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। এই জরিপগুলো নির্বাচনের জয়-পরাজয় নিয়ে প্রাথমিক একটি ধারণা দিলেও, তা সবসময় নির্ভুল হয় না। গত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে জরিপ মিলে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে তা চূড়ান্ত ফলাফলের চেয়ে অনেক দূরে ছিল।
২০২১ সালের সেই নির্বাচনের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা ও আসামের বুথফেরত জরিপগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতা একবার দেখে নেওয়া যাক।
পশ্চিমবঙ্গ
গত ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের অভাবনীয় জয় কোনও বুথফেরত জরিপই আঁচ করতে পারেনি। প্রতিটি সংস্থা বিজেপির আসন সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে বলেছিল, এমনকি কয়েকটি সংস্থা তো বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলেও বাজি ধরেছিল।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। সেবার তৃণমূল জিতেছিল ২১৫টি আসনে। বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন।
টুডে'স চাণক্য তৃণমূলের জন্য ১৬৯ থেকে ১৯১টি আসনের পূর্বাভাস দিয়েছিল, যা ছিল বাস্তবের সবচেয়ে কাছাকাছি। জন কি বাত তৃণমূলকে ১০৪ থেকে ১২১টি আসন দিয়ে ক্ষমতার বাইরে রেখেছিল এবং বিজেপি ১৬২ থেকে ১৮৫টি আসন পেয়ে জয়ী হবে বলে দাবি করেছিল। ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়াও বিজেপির সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা বলেছিল।
গড়ে সব সংস্থা তৃণমূলের আসন সংখ্যা ৬১টি কম এবং বিজেপির আসন ৪৯টি বেশি ধরে হিসাব করেছিল।
তামিলনাড়ু
তামিলনাড়ুতে জরিপ সংস্থাগুলো ডিএমকের জয়ের সঠিক পূর্বাভাস দিলেও তাদের আসন সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে বলেছিল। তবে ক্ষমতাসীন এআইএডিএমকে যে ক্ষমতা হারাচ্ছে, তা সব সংস্থা সঠিকভাবে ধরতে পেরেছিল।
২৩৪ আসনের এই রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ১১৮টি আসন। ডিএমকে ও তার মিত্ররা পেয়েছিল ১৫৯টি আসন, আর এআইএডিএমকে জোট পেয়েছিল ৭৫টি। টিভি ৯-পোলস্ট্র্যাট, শাইনিং ইন্ডিয়া নিউজ এবং প্যাট্রিয়টিক ভোটার ছিল বাস্তবের খুব কাছাকাছি। ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া ডিএমকে জোটের জন্য ১৭৫ থেকে ১৯৫টি আসনের আকাশচুম্বী পূর্বাভাস দিয়েছিল।
গড়ে জরিপগুলোতে ডিএমকের আসন ৭টি বেশি এবং এআইএডিএমকের আসন ১২টি কম দেখানো হয়েছিল।
কেরালা
কেরালাতে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) যে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসছে, তা জরিপগুলোতে উঠে এসেছিল। তবে তারা এলডিএফ-এর প্রকৃত শক্তি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং বিরোধী জোট ইউডিএফ-এর ভালো করার সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।
১৪০ আসনের কেরালায় এলডিএফ জিতেছিল ৯৯টি আসনে, আর ইউডিএফ পেয়েছিল ৪১টি। নিউজ ২৪-টুডে'স চাণক্য ৯৩ থেকে ১১১টি আসনের কথা বলে সবচেয়ে নির্ভুল ছিল। ইন্ডিয়া নিউজ-জন কি বাত এবং মনোরমা নিউজ-ভিএমআর ত্রিশঙ্কু বিধানসভা বা অত্যন্ত সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইঙ্গিত দিয়েছিল।
গড়ে জরিপগুলোতে এলডিএফ-এর ১৭টি আসন কম এবং ইউডিএফ-এর ১৫টি আসন বেশি ধরা হয়েছিল।
আসাম
আলোচিত এই চার রাজ্যের মধ্যে আসামেই বুথফেরত জরিপগুলো সবচেয়ে নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। বিজেপির পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার আভাস প্রায় প্রতিটি সংস্থা সঠিকভাবে দিয়েছিল।
১২৬ আসনের আসাম বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬৪টি আসন। বিজেপি জোট পেয়েছিল ৭৫টি এবং কংগ্রেস জোট জিতেছিল ৫০টি আসনে। ইন্ডিয়া নিউজ-জন কি বাত এবং নিউজ ২৪-টুডে'স চাণক্য সবচেয়ে সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছিল। তারা বিজেপির জন্য ৭০ থেকে ৮১টি আসনের কথা বলেছিল। টিভি ৯-পোলস্ট্র্যাট এবং ইন্ডিয়া অ্যাহেড-পি মার্ক ত্রিশঙ্কু বিধানসভার আশঙ্কা করেছিল।
গড়ে আসামের ক্ষেত্রে জরিপগুলোতে বিজেপি ও কংগ্রেস উভয় পক্ষেই মাত্র ৪টি আসনের এদিক-সেদিক পার্থক্য হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বুথফেরত জরিপ মানুষের মেজাজ বুঝতে সাহায্য করলেও পশ্চিমবঙ্গের মতো জটিল সমীকরণের রাজ্যে তা বারবার হোঁচট খেয়েছে। এবারও কি তেমন কিছু ঘটবে, নাকি জরিপই হবে আগাম সত্য, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৪ মে পর্যন্ত।



