ময়মনসিংহ বিভাগের কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারে (সিএসডি) কাগজপত্রে কয়েক শ টন গম উত্তোলন দেখানো হলেও বাস্তবে তা গুদামেই রয়ে যাওয়ার ঘটনাটি গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক এক অভিযানে এই অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। দেশের খাদ্যগুদাম নিয়ে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ফলে ময়মনসিংহের এই ঘটনায় অনিয়মের সত্যতা মেলার পর দায়ী কর্মকর্তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ঘটনার বিবরণ
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, একটি ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া ৩৮০ টন গমের মধ্যে প্রায় ৯৪ টন গম বাস্তবে উত্তোলিত না হলেও নথিপত্রে পুরোটারই ‘ডেলিভারি’ বা উত্তোলন সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। এই ঘটনা কেবল দাপ্তরিক গাফিলতি নয়; বরং এর পেছনে খাদ্য বিভাগের ভেতরের কোনো গভীর সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নকে জোরালো করে তোলে।
দায়ীদের অজুহাত
খাদ্য বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্য উত্তোলন করে তা থেকে আটা তৈরি করে সরকারি অন্য গুদামে সরবরাহ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট মিলমালিকের দাবি—কাজের চাপ, সময়ের স্বল্পতা ও পরিবহনসংকটের কারণে কাগজপত্রে উত্তোলন দেখানো হলেও বাস্তবে মাল সরানো সম্ভব হয়নি। এই যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি নথিপত্র বা রেজিস্টার কোনো আনুমানিক হিসাবের জায়গা নয় যে ‘পরে নিয়ে যাওয়া হবে’—এই শর্তে অগ্রিম উত্তোলন দেখিয়ে রাখা যাবে। কাগজপত্রে শতভাগ সরবরাহ দেখিয়ে বাস্তবে সরকারি মালামাল গুদামে রেখে দেওয়ার এই সংস্কৃতিই মূলত দুর্নীতি ও কালোবাজারির পথ সুগম করে।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ
খাদ্য বিভাগেরই একাংশের অভিযোগ, অনেক সময় এইভাবে কাগজপত্রে ভুয়া উত্তোলন দেখিয়ে পরে সেই খাদ্যশস্য সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। যেহেতু এখানে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ জড়িত থাকে, তাই সচরাচর এইসব অনিয়ম বাইরে আসে না। ময়মনসিংহের এই ঘটনা যদি জেলা প্রশাসনের আকস্মিক অভিযানের মাধ্যমে সামনে না আসত, তবে হয়তো এই ৯৪ টন গমের হিসাব নথিপত্রের আড়ালেই চাপা পড়ে যেত।
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা
জনগণের করের টাকায় কেনা সরকারি খাদ্যশস্য নিয়ে এই ধরনের লুকোচুরি কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। আমরা আশা করি, খাদ্যগুদামের এই অনিয়ম প্রকাশেই জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম থেমে থাকবে না, এই ঘটনায় তারা আরও কঠোর হবে। জড়িত সিএসডির কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট মিলমালিকের বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক। ময়মনসিংহসহ দেশের সব খাদ্যগুদামে এই ধরনের নিয়মিত অভিযান চালানো জরুরি।



