উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় রামমন্দিরের দানসামগ্রী লুটের তদন্তে বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠনের পর আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত শুক্রবার এই গ্রেপ্তারের পর মন্দির অছি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই ও সদস্য অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেছেন। পুলিশ গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বাড়ি ও অন্যান্য স্থানে রাতভর তল্লাশি চালিয়ে ৮০ লাখ রুপি উদ্ধার করেছে।
দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
রুপি ও গয়না চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে রাজনীতি সরগরম। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি (এসপি), আম আদমি পার্টি (এপিপি), তৃণমূল কংগ্রেস ও বামপন্থীরা দাবি জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের তদারকিতে তদন্ত চালাতে হবে। নইলে ছোটখাটো অপরাধীরা ধরা পড়বে, বড় বড় হোতারা অধরা থেকে যাবে।
বিজেপির অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন
অযোধ্যাকাণ্ড নিয়ে বিজেপির অভ্যন্তরেও চলছে মারাত্মক টানাপড়েন। আগামী বছর উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন। বিরোধীরা এই চুরির জন্য রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে কোণঠাসা করতে চাইলেও মুখ্যমন্ত্রীর অনুগামীরা দায়ভার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর চাপাতে চান। যোগীদের দাবি, অযোধ্যায় ট্রাস্ট গঠনসহ সব সিদ্ধান্তই কেন্দ্রীয় স্তরে নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’। ট্রাস্টের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মনোনীত।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবের ভূমিকা
যোগীর অনুগামীদের আরও দাবি, ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব নৃপেন্দ্র মিশ্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত আস্থাভাজন এই আমলার ওপরই ছিল মন্দির নির্মাণের দায়িত্ব। তিনিই ছিলেন মন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান। কাজেই দুর্নীতির দায়ভার বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এড়াতে পারে না।
অর্থ ও গয়না চুরির পরিমাণ
অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের সময় থেকে বিতর্ক লেগেই রয়েছে। এবারের দুর্নীতি দেশ-বিদেশের ভক্তদের দেওয়া দানের অর্থ ও সামগ্রী চুরির। কত কোটি টাকা নগদ ও কত কোটির গয়না চুরি হয়েছে, এখনো তার পূর্ণ হিসাব কারও কাছে নেই। অনুমান, মন্দিরের কোষাগার থেকে চুরি হয়েছে কয়েক শ কোটি টাকা। বিরোধীদের অভিযোগ, আত্মসাৎ করা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি রুপি। দানের অর্থ ও সামগ্রীর হিসাব রাখার কোনো বন্দোবস্তই মন্দির কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো করেনি।
এসআইটির প্রতিবেদন
উত্তর প্রদেশ রাজ্য সরকারের কাছে ‘এসআইটি’র জমা পড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুরু থেকেই মন্দির পরিচালন কমিটির লোকজন ধারাবাহিকভাবে অনুদান চুরি করে গেছেন। প্রতিদিন দানসামগ্রী গোনা হতো। সে সময় কখনো সিসি ক্যামেরা বন্ধ রাখা হতো, কখনো এমনভাবে ক্যামেরা আড়াল করা হতো, যাতে চুরি ধরা না পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দানের অর্থ ও গয়না লুকিয়ে রাখা হতো মন্দিরের শৌচাগারে। দৈনিক লাখ লাখ টাকা জমা পড়লেও হিসাবে দেখা যেত ক্রমেই তা কমতে কমতে কয়েক হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে।
গ্রেপ্তার ও পদত্যাগ
যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশ মন্দিরে জমা পড়া অর্থ ও দানসামগ্রী গোনার কাজের সঙ্গে যুক্ত। বিরোধীদের অভিযোগ, চম্পত রাই ও অনিল মিশ্রকে কেন এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। কেন তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ এখনো কোনো এফআইআর করেনি। চম্পত রাই ও অনিল মিশ্র দুজনেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) শীর্ষ নেতা। যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের কেউ চম্পতের গাড়িচালক ছিলেন, কেউ কেউ আবার অনিলের আত্মীয়।
বিরোধীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার
বিরোধীরা অযোধ্যাকাণ্ডকে নতুনভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে তুলতে চাইছে। কংগ্রেস নেতা রাজিব শুক্লা সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন, চাঁইদের আশীর্বাদ ছাড়া অনুগতদের পক্ষে এভাবে কোটি কোটি টাকা চুরি করা সম্ভব নয়। কংগ্রেসের কে সি বেনুগোপাল বলেছেন, হিন্দুত্বের স্বঘোষিত অভিভাবকদের মুখোশ খুলে গেছে। ভগবানের নাম নিয়ে ভগবানের সম্পত্তি চুরি করতে তাঁদের বাধে না।
অন্যান্য দলের প্রতিক্রিয়া
আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেছেন, মন্দিরের চাঁদা চোরদের প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানো দরকার। তাঁর প্রশ্ন, চম্পত রাইদের গ্রেপ্তার করতে প্রধানমন্ত্রীর এত অনীহা কেন? উদ্ধব গোষ্ঠী শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত বলেছেন, মন্দির নির্মাণের সময় উদ্ধব ঠাকরে এক কোটি রুপি নগদ ও চার কেজি রুপার ইট মন্দিরে দান করেছিলেন। মন্দির কর্তৃপক্ষ আজও তার রসিদ দেয়নি।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে যাচ্ছে বুঝতে পেরে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এসআইটি গঠনের নির্দেশ দেন। আটজনকে গ্রেপ্তারের পর তিনি বলেছেন, অপরাধীরা ছাড়া পাবে না। তবে বিরোধীরা যেন রামভক্তদের ধৈর্যের পরীক্ষা না নেন।
পুরোনো দুর্নীতির অভিযোগ
অযোধ্যার রামমন্দিরে আজ যে চুরি ধরা পড়েছে, তার সূত্রপাত মন্দির তৈরির সময় থেকেই। ২০২১ সালে মন্দির তৈরির জন্য ট্রাস্টের জমি কেনাকে কেন্দ্র করে আর্থিক দুর্নীতির বিরাট অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, কিছু ভূস্বামী ও জমি কেনাবেচা ব্যবসায়ী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দুই কোটি রুপিতে জমি কিনে মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছে ২০ কোটিতে বিক্রি করেছিল।
সুপ্রিম কোর্টের তদারকির দাবি
বিরোধীরা এখনো রাজ্য সরকারের তদন্তের ওপর ভরসা রাখতে রাজি নন। তাঁদের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের তদারকিতে নতুনভাবে তদন্ত হোক। নইলে রাঘববোয়ালেরা পার পেয়ে যাবেন। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই বিতর্কে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে কোণঠাসা করতে বিরোধীরা সচেষ্ট।



