রাজধানী ঢাকা যেন ধীরে ধীরে একটি সমান্তরাল অর্থনীতির নগরীতে পরিণত হচ্ছে। এখানে রাষ্ট্রের আইনের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজির অলিখিত বিধান। ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, কাঁচাবাজার, বস্তি, বাস–ট্রাক–লেগুনাস্ট্যান্ড, ঝুট ব্যবসা, নির্মাণকাজ, এমনকি বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ—সবখানেই চলছে সংগঠিত চাঁদাবাজি। ভয়ংকর বিষয় হলো এটি আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাদার সন্ত্রাসী ও প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশে একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা’য় রূপ নিয়েছে।
পুলিশের তালিকা ও প্রশাসনের ভূমিকা
ঢাকা মহানগর পুলিশের সাম্প্রতিক তালিকায় ১ হাজার ২৮০ জন চাঁদাবাজ এবং ৩১৪ জন আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতার নাম রয়েছে। এই তালিকাই বলছে, চাঁদাবাজির সুযোগ করে দিয়ে পুলিশের কিছু সদস্যও টাকার ভাগ পান। অর্থাৎ যাঁরা অপরাধ দমন করবেন, তাঁদের একাংশই যখন অপরাধ অর্থনীতির সুবিধাভোগী হয়ে ওঠেন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রশ্নটি ভয়াবহভাবে হুমকির মুখে পড়ে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে চাঁদাবাজির সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, পেশাদার সন্ত্রাসী এবং থানার কিছু কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। তাঁদের তরফ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবতা হলো, দিনের পর দিন পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই এসব অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজি চলছে। এটি প্রমাণ করে, সমস্যা কোনো এক পক্ষের নয়; সমস্যা ব্যবস্থার।
রাজনৈতিক চরিত্র ও পতাকা বদল
এ ব্যবস্থার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর রাজনৈতিক চরিত্র। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যাঁরা চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রক ছিলেন, সরকার পরিবর্তনের পর অনেক জায়গায় সেই নিয়ন্ত্রণ গেছে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের হাতে; কোথাও নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিরাও জড়িয়ে পড়েছেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক পতাকা বদলেছে, কিন্তু চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বদলায়নি। এতে স্পষ্ট হয়, এটি কোনো একক দলের সমস্যা নয়; বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত একটি ‘রোগ’।
সাধারণ মানুষের ভুক্তভোগী
চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। ফুটপাতের দোকানদার প্রতিদিন চাঁদা দেন, লেগুনাচালক মাসোয়ারা দেন, ফল ব্যবসায়ী ট্রাকপ্রতি টাকা দেন, বস্তিবাসী অবৈধ সংযোগের নামে অতিরিক্ত অর্থ দেন। শেষ পর্যন্ত এই অর্থের বোঝা গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। অর্থাৎ চাঁদাবাজি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি নগর অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একধরনের ‘অঘোষিত কর’।
অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী চক্র
আরও ভয়ংকর হচ্ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী চক্রের সক্রিয়তা। পুলিশের তালিকায় ১৪৮ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে, যারা চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। বিদেশে বসে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও অভিযোগ আছে। তাদের হয়ে স্থানীয় বাহিনী চাঁদা তোলে, দখল নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যবসায়ীদের ভয় দেখায়। চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটছে। মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার, পল্লবী, গুলশান—প্রতিটি হত্যার পেছনে উঠে আসছে একই বিষয়—আধিপত্য ও চাঁদাবাজি।
নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা
চাঁদাবাজির অনেক ক্ষেত্র আবার নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার সঙ্গেও জড়িত। ফুটপাত দখল, অবৈধ কাঁচাবাজার, বস্তির অবৈধ সংযোগ—এসবের পেছনে জীবিকার প্রশ্নও আছে। নগর–পরিকল্পনাবিদেরা সঠিকভাবেই বলেছেন, কেবল উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না। সিটি করপোরেশন যদি পরিকল্পিতভাবে ফুটপাতের একাংশে নিয়ন্ত্রিত হকার–ব্যবস্থা চালু করে, বস্তিতে বৈধ সেবা সংযোগ দেয় এবং পরিবহনব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনে, তাহলে চাঁদাবাজির বড় একটি ক্ষেত্র সংকুচিত হবে। কিন্তু সেই উদ্যোগ নিতে হলে রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি মোকাবিলা করতে হবে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থনৈতিক উৎস
দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে চাঁদাবাজি অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনৈতিক উৎসে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনী রাজনীতি, দলীয় আধিপত্য ও এলাকায় প্রভাব ধরে রাখতে এই অর্থ ব্যবহৃত হয়। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে ‘জিরো টলারেন্স’ বললেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর পরিবর্তন দেখা যায় না, বরং অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় দল বদলে নতুন পরিচয়ে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আমরা মনে করি, রাজধানীবাসী এখন শুধু নতুন তালিকা বা নতুন অভিযান দেখতে চায় না, তারা দেখতে চায় চাঁদাবাজির এই রাজনৈতিক-প্রশাসনিক নেক্সাস ভাঙা হচ্ছে কি না। এই নেক্সাস ভাঙা না হলে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না।



